শুক্রবার, ১ আগস্ট, ২০১৪

গল্প / সাপলুডু



শিউলি চিরকুটে চোখ বুলিয়েই বলে উঠলেন-


-উনি কোথায়? হ্যাঁ, চলে আসতে বলুন।


-স্যার বাসার গেটে; গাড়িতে । আপনি একটু আসবেন?


দুতলার সিঁড়ি ভেঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন তিনি। আজ মৃত্তিকা আর আকাশের প্রথম সাক্ষাৎ।


তাঁর পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে- কাঁপুনির মাত্রা এত তীব্র হতে পারে তিনি তা ঘূণাক্ষরেও ভাবেননি। ভাবতে পারার কথাও নয়। দীর্ঘ আঠারো বছর পর এ রকম কেউ ভাবতে পারে না। শিউলি কাঁপছেন আর ভাবছেন- কীভাবে তাঁকে রিসিভ করবেন ।


২.


শত সহস্র সবুজ সকাল আর রোদেলা দুপুর শেষে সায়াহ্ণের শেষ রাগিনী এখন বেজে উঠেছে; কিন্তু এই নামটি তাঁর কাছে আজও এক অমেয় শক্তির উৎস। তাই বুঝি আধাঁর রাতের চোরাগলি তাঁকে ছুঁতে পারেনি এতটুকু। এটি আঠারো বছর ধরে জ্বলতে থাকা এক জীবনবাতি । সতের বছরের যন্ত্রণা আর অবরোধবোধকে ছুঁড়ে মারতে পেরেছিলেন তিনি এই একটি নামের প্রচন্ড শক্তিতে। সেদিন উষ্ণ উত্তেজনা আর অপার আনন্দের হাতছানিতে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন পঁচিশের ঘরে। আহা, কী মুক্তি! আনিস আহমেদ অযাচিতভাবেই নামটি পেয়েছিলেন ভালবাসার মহার্ঘ্যরূপে। কেউ যদি এভাবে অতল শূন্যতার নীলযন্ত্রণায় নিজেকে উন্মোচন করেন যে কোন মানুষ সহজে গলে যাবেন; দ্বিতীয় চিন্তা তার মাথায় আসবে না। কয়েক দিনের আলাপচারিতা- সেই মায়াবি কণ্ঠের তীব্র আকর্ষণ, অভাবনয়ীয় মুক্তির স্বপ্নে তিনি আজীবন ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।


আনিস আহমেদ ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখি করতেন। তাঁর কবিতার অনুরাগী নিরালা তাঁরই প্রেমে পড়ে মনের অজান্তে। নিরালা নিরালাই- কোন রকম সাতপাঁচ সে বোঝে না। প্রেমে পড়েছে-কূলে ডুবেছে। বিয়ে করেই সে মুক্তি খোঁজে। অবশেষে একদিন বিয়ের সাঁনাই বেজে ওঠে। বিয়ের পর পরই আনিসের বাবা মারা যায়। নাগরিক জীবনের জটিলতা আর পেশাগত ব্যস্ততায় এবার যেন খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। লেখলেখি বন্ধ হয়ে যায় -সকাল বিকেল অফিস।  শহর থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব একশো কিলোমিটার। কিন্তু পড়ার নেশাটা তাকে চেপে বসে দ্বিগুণ। রোহিতের আট বছর পর রিমি ঘরে আসে। রিমির আধো আধো কথা, মিটমিটে তারার মতো দুই চোখ তাঁকে আবার আনমনা করে তোলে- লেখালেখির দিকে টেনে নেয়।


ফেসবুক দূরের মানুষকে কাছে আনে; কাছের মানুষকে দূরে টেলে দেয়- দিন দিন বাড়তে থাকে বন্ধুদের তালিকা। এভাবে একদিন শিউলির সাথে তাঁর পরিচয়।


আনিসের গল্পকবিতার জন্যে যেন অধীর অপেক্ষায় থাকেন শিউলি। প্রতিটি লেখার নির্মোহ বিশ্লেষণে পারদর্শী মেয়েটি। তাঁর লেখা কয়েকটি ছোট কবিতা আনিসের দৃষ্টি কাড়ে- কৌতূহল বাড়তে থাকে। ছোট ছোট পংক্তির আটপৌরে শব্দরাজি তীরের ফলার মতো শাণিত - এক গভীর বোধ ও বেদনায় আচ্ছন্ন করে তোলে তাঁকে। একদিন নিছক খেয়ালের বসে আলাপ শুরু।


আপনার কি লেখালেখির প্রতি দুর্বলতা আছে?


-একটু একটু আছে।


শিউলি আনিসকে লেখালেখি বন্ধ না করতে অনুরোধ করেন। এক মাসের মাথায় তাঁরা ভালো বন্ধুরূপে পরস্পরের মনে জায়গা করে নেয়। এক ফাঁকে শিউলি তাঁর সাথে ফোনে কথা বলার আগ্রহ দেখায়। একদিন শেষ বিকেলে বেজে উঠে আনিসের মুঠোফোন।


হ্যালো, শিউলি বলছি- কেমন আছেন?


ওহ আপনি? ভালো। কী খবর বলুন। আপনি কেমন আছেন?


ভালো আছি। আপনি কোথায়?


বাসায়।


কে কে আছেন ? কথা বলা যাবে?


সবাই আছে। এক মিনিট পর আমি রিং করছি।


তারপর আনিস বাইরে আসেন। একচল্লিশ মিনিট কথা বলার পর আনিসের মধ্যে এক ধরনের বিমূঢ় বেদনা কাজ করে, করতে থাকে। জীবন এমনও হয়!


৩.


হ্যালো, হ্যালো, কেমন আছেন?


এই তো, আছি এক রকম।         


কেন? এক রকম কেন?


দেখুন কেউ কি সব সময় ভাল থাকে। সব সময় এক নয় মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত আলাদা আলাদা সুর আর স্বরে জীবনকে স্পর্শ করে। এই যে একটু কথা বলবো গতকাল থেকে এই অপেক্ষা ।


বাসায় আর কে কে আছে?  আপনি তো বেশ একা।


না, তেমন একা নয়। মিলি আর মাধুর্য আমার সঙ্গে থাকে-আমার ভাইয়ের দুই মেয়ে । ওরা আমাকে মা ডাকে। এই ডাক শুনলে মাঝে মাঝে আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। অভিশপ্ত জীবন আমার ... ...।


হায়, এভাবে জীবন চলে! আমি  বুঝতে পারছি না- আপনি কেন এই দীর্ঘ সময়টুকু নিজেকে বঞ্চিত করলেন। কথাগুলো খুলে বললে হয়তো অনেক আগেই একটি সমাধান হয়ে যেত। (শিউলির কণ্ঠ আস্তে আস্তে ভারি হয়ে উঠে- দীর্ঘশ্বাসের তীব্রতা মোবাইলের গায়ে লেগে আনিসের কানে আছড়ে পড়ে।) স্যরি,আপনি কি কাঁদছেন? আনিস খুব সহজে বুঝতে পারছেন- ওপারে তিরিশ উত্তর এক নারী কাঁদছেন।


ওহ, ভাইজানের নামটা বলবেন? আপনাদের নিজেদের কোন সমস্যা নেই তো?


ওর নাম বাশার, আমি তাকে বকুল বলে ডাকি। তাই আমাদের বাড়ির নাম দিয়েছি- বকুলবিলাস।


ভাইজানকে ডাকেন বকুল। বেশ ভালোই তো। আর আমাকে?


আকাশ- আপনি আমার আকাশ; যাঁর বুকে আমার স্বপ্নরা লালনীলশাদা মেঘ হয়ে উড়ে বেড়ায়- মুক্তি খোঁজে।


খুব ভারি কথা। উনি কী করেন ?


পারিবারিকভাবে ওদের রেস্টুরন্ট বিজনেস। দেশে ফেরার পর উর্বশী আর অপ্সরী নামে আরো দুটো মটেল করেছে। এটি পর্যটন শহর-সারা বছরই গেস্ট থাকে।


ওহ, মূল কথায় আসি। আপনার বইগুলোর বিষয়ে বলুন- কারা, কখন প্রকাশ করলো ? জানেন তো দীর্ঘদিন লিখিনি।


হ্যাঁ, আমার তিনটি উপন্যাস আর দুটো কাব্যগ্রন্থ আছে। লেখালেখি মানে ব্যস্ত থাকা। তবে আমার পড়তে ভালো লাগে- পড়ার নেশা আমার আছে। এগুলো ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে- শুদ্ধস্বর, ঐতিহ্য, পারিজাত ও পাঠসূত্র বইগুলো করেছে।


৪.


হ্যালো, আকাশ বলছি-কেমন আছেন?


হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি?


আমি ভালো। আজ আকাশ বেশ মেঘলা, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। একটি সুখবর আছে- আপনার নতুন নাম মৃত্তিকা। এটি আমার দেয়া। না করবেন না প্লিজ। গতকাল আমি চিকিৎসার কথা বলেছিলাম। আপনারা দুজনের... .. ..


হ্যাঁ, মৃত্তিকা- গভীর,গম্ভীর- ব্যঞ্জনাটা বেশ আলাদা। সারাজীবন মাটির মতো সব সয়ে গেলাম। জুতসই নামের জন্যে ধন্যবাদ। না, আমার কোন সমস্যা নেই। জানেন- নিঃসন্তান নামের অপবাদটা আমাকেই শুনতে হয়েছে দীর্ঘদিন। বিয়ের তিন বছর পর সবাই বলাবলি শুরু করলে সে সেকেন্ড ম্যারেজ করে- তাঁর দূর সম্পর্কের এক মামাতো বোনকে। বিয়ের তের দিনের মাথায় সে সংসার ভেঙ্গে যায়। তখনই নানা কথা হাওয়ায় উড়তে শুরু করে।


কী কথা- বলা যাবে? সে সংসার তো এখন নেই।


রাইসা বিয়ের দুদিন পরই মুখ খোলে। তার দাদিকে বলে- বাশার অসুস্থ্, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নেই। তখন সবাই আমার দিকে মুখ দেখাদেখি শুরু করে, আমি নীরবতায় চুপসে যাই। এই নীরবতাই এখন আমার জীবনের কাল হয়েছে।


আচ্ছা, রাইসা যা দুদিনের মাথায় পারলো তা আপনি এতদিনেও পারলেন না কেন? আপনার এমন কেউ কি ছিল না-যাঁরা আপনাকে... ...?


সবাই সব কিছু সমান পারে না। ভেবেছিলাম একদিন ঠিক হয়ে যাবে। শরীর বিষয়ে আমি বেশ মুর্খ- তা ছাড়া পুরুষের সুস্থতা মাপার নিক্তি তো আমার হাতে নেই। তার আচরণে কোন অমিল তেমন দেখিনি। শরীরী প্রসঙ্গে ও প্রায় নীরব থাকে। মাঝে মাঝে তাঁর এক ডাক্তার বন্ধুর সাথে আলাপ করে। সে তখন ঠাট্টা করে বলতো- তোমাকে আবার বিয়ে দিতে হবে। তখন তাঁর অক্ষমতার বিষয়টি আমি বুঝি। আমার মন ও শরীর তীব্র বঞ্চনায় আজ নীল হয়ে আছে। এভাবে আমি দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ি। মাঝে মাঝে মাথার দুঃসহ ব্যথায় ছটফট করি- বমি আসে। প্রেসারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।


আপনি কি বিকল্প কিছু ভাবছেন?


না, তা বলিনি। কোন মানুষ কিছু কথা মনের ভেতর দাগ কেটে যায়, জখমটা কখনো সারে না।


যখন সব সয়ে গেলেন-এখন আবার এইসব কেন? এ জন্যে দায়ী কে?


যদি বলি আপনি।


(আকাশ এই বাক্যবাণে পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।) আমরা যেহেতু ভাল বন্ধু- দায়তো নিতেই হয়। দুঃখিত। আপনাকে আদৌ কষ্ট দিতে চাইনি।


আপনাদের বিয়ে হলো কয় বছর আগে?


এগারো বছর আগে। পারিবারিক বিয়ে। ও বয়সে আমার বছর দশেক বড়।  বিয়ের দুই বছর পর আমার মা মারা গেলে আমাকে বেশির ভাগ সময় অসুস্থ বাবাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। ভাইয়ের পড়ালেখা, দুইবোনের বিয়ের কথা ভেবেছি দিনের পর দিন। তাদের বিয়ে দিলাম। এভাবে সময় গড়িয়ে গেল। যখন নিজের দিকে তাকাই বুকটা হুহু করে উঠে।


আমরা যে কথা বলছি- কিছু মনে করছেন না তো? আপনার পরিবারের আবহাওয়াটা কেমন?


আমি তার সাথে খোলামেলা আলাপ করি। আমরা উদার হলেও উগ্রতাকে পছন্দ করি না। এ রকম পরিবেশে বাবা আমাদের বড়ো করেছেন।


ঠিক আছে। শরীরের দিকে খেয়াল রাখবেন। ভাল থাকুন । আজ রাখি।


আপনিও ভাল থাকবেন।


৫.


হ্যালো, মৃত্তিকা কেমন আছেন? আজও ডিস্টার্ব করছি।


ভালো আছি। ডিস্টার্ব হবে কেন? আমি তো আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকি।


ধন্যবাদ, শুনে খুবই ভালো লাগল।


আপনি কেমন আছেন? আমি মুক্ত।


আপনি মুক্ত- কীভাবে! মানুষ কখনো মুক্ত হতে পারে ? আমৃত্যু হাজারো শেকল তাকে আঁটসাঁটে বেঁধে রাখে। যাকে আমরা ডিসিপ্লিন বলি।


ঠিক আছে। মাঝে মাঝে আসতে পারবেন তো ?


অহ, তাই ; যাওয়া যায়। কিন্তু এই যাওয়া-আসা একদিন সংজ্ঞা খুঁজবে, পরিচিতি চাইবে। আমাদের পরিবার বয়স পেশা তা কতটুকু অ্যালাও করবে- তা কিন্তু ভাববার বিষয়।


বাশার ভাইয়ের সাথে আপনার কী কোন গ্যাপ আছে?


না, আমরা খোলামেলা কথা বলি। সে কখনো আমাকে সন্দেহ করে না।


ফাইন, গুড রিলেশান। উনি আপনাকে সময় কেমন দেন? আপনার স্যাটিসফেকশান কেমন ?


রাতে বারোটার দিকে একবার দেখা হয়- তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। সে টা তো শূন্যের কোটায়।


হায়, আপনি তো অসুস্হ্য হয়ে যাবেন। এভাবে... ... ..


আমি প্রায়ই অসুস্থ থাকি। মাথা ব্যথা আর রক্তচাপ তো জীবনসঙ্গী হয়ে আছে।


আপনার ওয়েট কেমন? হাইটের সাথে মিল আছে আছে তো ?


এই তো ষাট-একষট্টি থাকে। আমি  লম্বা না-পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি।


আপনার কালার বেশ চমৎকার।


এখন তেমন নেই- হ্যাঁ এক সময় তা ছিল।


বয়স তো তেমন বেশি নয় আবার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখা শুরু করতে পারেন।


চত্রিশ বছর কম সময় নয়। আবার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখায় ফিরে যেতে চাই না। বরং আপনার কথা বলুন- শুনি, এখন কী করছেন?


আমার কী জানতে চান? সবই বলেছি। আমি ভূত নয়- ছেলে মানুষ; বউবাচ্ছা নিয়ে আছি যুগের সাথে তাল মেলাতে পারি নাহৃদয় কাজ বেশি করে- মস্তিষ্ক কাজ করে না লাভ লোকসান বুঝি না- বুঝতে চাই নামানুষকে ভালবাসি-ভালোবাসা পেতে চাই জীবনকে ভালো লাগে হ্যাঁ, আমাদের দেখা হবে। আপনি যখনই চান।





একদিন হঠাৎ ফোন ধরা বন্ধ করে দেন মৃত্তিকা। অকারণে-একতরফাভাবে। আকাশ বার বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এমনকি তাঁকে আর ফেসবুকে পাওয়া যায় না। না, ছোড়বান্দা আকাশ এবার সবকিছু সংরক্ষণ করতে শুরু করেন। ছবির অ্যালবাম, চ্যাটিং সংলাপ, মুঠোফোনের দীর্ঘ আলাপ সবই তিনি সযতনে রাখেন। প্রস্তুতি নিতে থাকেন যে কোন মূল্যে মুখোমুখি  হবার। তখন তাঁর একটি স্ট্যাটাস ফেসবুকে তুমুল ঝড় তোলে-


কোথায় লুকোবে তুমি- সঙ্গমে শৃঙ্গারে, শূন্যতায় সংসারে- হৃদয়ে রেখেছি পুঁতে ঈশ্বরের চোখ- সাথে নিজের তরুণতম ছবিটির ডানভাগ দ্বিখণ্ডিত নামে কাভার ব্যানার হিসেবে আপলোড করেন। বিষয়টি আর কারো অজানা থাকে না।


৬.


কেউ এই বয়সে একা হাসপাতালে আসে না। আসার কথা নয়। যার পরিবার পরিজন আছে- তিনি কেন এ রকম করবেন। সকাল সাড়ে এগারোটায় আজাদ নামের এক তরুণ কর্মচারী তাঁকে হাসপাতালে রেখে যায়। ডাক্তাররা তাঁর একজন আ্যাটেনডেন্টের কথা বলছেন। শ্বাসকষ্টটা বাড়ে- হঠাৎ বমি আসে। কখনো বুকের ব্যথায় দাঁতের পাটি দুটো খিঁচে থাকেন। গায়ে জ্বর- পাঁচ দিন ধরে অসুস্হ তিনি। আনিস আহমেদ এখন একটি কাগুজে নাম মাত্র। সোসাইটির কেউ এ নামে তাঁকে চেনে না। মেডিক্যাল কলেজের ৩০৩ নং ক্যাবিন। ফ্যামিলির কেউ নেই। কর্মস্থল থেকে সরাসরি হাসপাতালে। শুয়ে শুয়ে পুরোদিন খবরের কাগজ আর কবিতার বই পড়েন। এক নিরীশ্বর পৃথিবীর কথা ভাবেন- যেখানে প্রেম নেই, স্বপ্ন নেই; কিছু বিপন্ন বোধ নিঃসঙ্গ মানুষকে তাড়া করে।


দরজাটা প্রায় খোলাই থাকে। এই অতিরিক্ত কাব্যকাতরতা পাশের ক্যাবিনগুলোর রোগীর আত্মীয়স্বজনকে একটু হতচকিয়ে তুলে। তাদের কেউ কেউ আঁচ করেছেন গভীর অভিমানে তিনি পলাতক। শাহেদ তাঁর সঙ্গে খাতির জমায় সময় কাটাবার অছিলায়। তারও সময় কাটে না। খবরের কাগজের খেলাধুলার পাতাগুলোই মনের খোরাক । সে  বড় মামাকে নিয়ে পাশের ক্যাবিনে আছে- আজ নয় দিন ।


রাত দুটোয় বুকের ব্যথাটা হঠাৎ বেড়ে যায়- মুখ ভরে বমি আসে। দরজাটা খোলা দেখে উঁকি দিতে গেলেই শাহেদ বুঝতে পারে মুরুব্বির সময় শেষ। তখন তাঁর পুরো শরীর ঘামে ভেজা। সে তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নার্স ডাকতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে একজন আয়া দৌড়ে আসে।





৭.


আনিস স্বপ্নকে ছুঁয়ে যাবে, নিরালার নৈকট্য তাঁকে করে তুলবে প্রবল আত্মবিশ্বাসী-এই প্রত্যয়ে জীবনটি শুরু হয়েছিল। তা দিনে দিনে ফিকে হয়ে গেছে। যেখানে কোন চকচকে গাড়ির স্বপ্ন নেই, সুরম্য প্রাসাদের আকাঙক্ষা নেই, বিদেশের সেরা লোকেসনগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা আকাশকুসুম কল্পনা- সেখানে একজন আধুনিক শিক্ষিত নারীর দম তো বন্ধ হয়ে আসতে পারে। হাঁপিয়ে ওঠেন নিরালা। জীবনের শুরুতে আনিসকে দেয়া কথাগুলো এখন অনেকটা তাঁর মনে নেই। দর কষাকষিটা শুরু হয়েছিল রোহিত কোন মিডিয়ামে পড়বে- বাংলা না ইংলিশ তা নিয়ে। পরে এটি ডালপালা মেলেছে। শহরে এক টুকরো জমি, ফ্ল্যাটবাড়ি এই সব ইস্যু নিরালা-আনিসের বন্ধনটুকু শিথিল করে দেয় ।





মানুষ তার গন্তব্য জানে না। সাপলুড়ু খেলার মতো সে হাঁটতে গিয়ে দৌড়ায় আবার দৌড়াতে গিয়ে  কুপোকাত। কে হাঁটেন, কে হাঁটান; কে দৌড়েন, কে দৌড়ান তা সে ভাবে না। এই অবকাশটুকু তার নেই। অথবা সে ভাবতে জানে না। আবার কেউ কেউ ভাবেন; ভেবে কী হবে-কোন কূল কিনারা নেই। কিন্তু সে মন্তব্য করতে ভালেবাসে, গন্তব্য চেনে না। সময় আর জীবনের সম্পর্ক ভুলে যায় অনায়াশে। ভোগে বিশ্বাসী মানুষ উপভোগের কদর বোঝে না। অনুভূতির জগতে একদিন সে ফতুর হয়ে পড়ে।


ছক কাটা ঘর থেকে বের হতে চেয়েছে আকাশ- রোদের আলোয় পুড়তে ভালোবেসেছে, জোছনার আভায় ভিজতে ভালোবেসেছে। এই সরল সময়যাপনই তাঁকে পরিবার-পরিজনের কাছে উনমানুষে পরিণত করে। নিরালা-তার স্ত্রী; দুজন দুজনের বন্ধু। বত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পূর্বেও তাঁদের বন্ধুতা ছিল কয়েক বছর। জানাশোনা, ঘোরাঘুরি, আড্ডবাজি সবই তো ছিল। ক্যাম্পাসের পরিচিত যুগলদের মধ্যে তাঁরাই ছিল শীর্ষজুটি। কিন্তু দাম্পত্যের বিপ্রতীপ বিন্যাসে দায়বোধ যতটা বেড়েছে অনুভবের তীব্রতা কমেছে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। কেন এমন হলো! কেন এমন হবে!


সেই ছোট রিমি এখন কানাডায়- যার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ছড়া শোনাতেন তরুণ অনিস। প্রকৌশলী তুহিনের সংসার আলো করে তাদের ঘরে এসেছে সারাহ আর সুজাত। এই কথাগুলো মনে পড়লে ক্যাবিনের এই একা একঘেঁয়ে জীবনেও যেন এক মায়াবী সুরের দোলা নেচে যায়। সুজাত  একদম রোহিতের মতো- মামার ফটোকপি যেন।


৮.


অ্যাম্বুলেন্সটি সকাল নটা নাগাদ বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো। সঙ্গে দুজন তরুণ- রাশেদ ও আজাদ। যাঁরা গত চার দিন ধরে তাঁর সেবা করেছেন। ঔষধপত্র খাবার দাবার এনে দিয়েছেন- পরম ভালোবাসায়। রাশেদের পকেটেই চিঠিটি ছিল।  চিঠি নিয়ে সে সরাসরি গেট পেরিয়ে বাসায় ভেতরে ঢোকে। কলিং বেল বাজাতেই এক ভদ্র মহিলা দরজা খুলে চিঠিটি নিলেন। শিউলিকে লেখা এক টুকরো পুরোন কাগজ।


নীল, আমি এসেছি; আর কোথাও যাবো না কিন্তু। হ্যাঁ, এটি আমাদের প্রথম দেখা। তুমি যে বলেছিলে- মাঝে মাঝে আসতে পারবেন তো -দুঃখিত, তখন আসতে পারিনি। কেন পারিনি তা তো তুমি জান। আজ হঠাৎ ভাবলাম তোমাকে না দেখে আমার ফেরা হবে না। আমি আমার কথা রেখেছি। তুমি কী এখন আমাকে চিনবে? আমি তোমার আকাশ- যার বুকে মাথা রেখে নীলমেঘ ঘুমিয়েছে অনেক রাত।


তুমি এবার আমাকে নিরালার কাছে নিয়ে যাবে- সে যাতে আর আমাদের আর ভুল না বোঝে।




বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০১৪

ঘুড়ি


লালনীল ঘুড়ি ছেড়েছে জমিন
              ডানায় জেগেছে বেগ,
নতুন ঠিকানা তার আকাশআঙিনা জুড়ে
             ক্ষণে ক্ষণে বাড়ে মেঘ !

উড়ালউচ্ছ্বাসে ডিগবাজি খেয়ে
                    বিহঙ্গপাখায় নাচে
মেঘের ওপরে মেঘে
উলকাআবেগে ছোটে নীলিমার কাছে কাছে;

নতুন আকাশ নাচে বুকের ভেতর                 
                         গোপনে একান্তে,
ঘুড়িটি ছেড়েছে ঘর কেটেছে সাকিনসুতো
মনের অজান্তে !   



১৭.০৭.২০১৪ ইং   

মেঘবোন


মধ্যাহ্নের মেঘবোন আকাশকে ছুঁয়ে দিলে সবুজ গ্রামের সারি
নীলাভ নদীর ঢেউ সামিয়ানা কাঁপে;

সমুদ্রসারস উড়ে নিজেকে হারায়- গাঙকবুতর ভুলে ভাসমান বয়া;

জল নয়, ছায়া নয়-বিবাগী বাউল তুমি শুধু ভেসে চলা;
যদিও মুহুরি নদী তোমার মতন ছুটে মোহনা মায়ায় বিদিত সাকিন তার ;
মৈনাক আকুল হয়ে বাড়ায় দুহাত তোমার প্রণয় যাচে ঘন বরষার ভোরে।

এই সব জেনে শুনে নীলিমা ছেড়েছে ঘর-নিতম্বে পলাশ ফোটে;

আধাঁর মাড়িয়ে আজো দাঁড়িয়ে রয়েছি-ইটভাটার চিমনি;
ধোঁয়ার শরীর আর আগুন কুন্ডলি ভুলে মঙ্গলমায়ায়, নীল মেঘফুলে।

মরীচিকা

রুপোর দরিয়া জোছনা মোহনায়
ভুরুর দ্রাঘিমা চোখের দু’পাতায়
- তোমাকে এঁকেছি ।

পাতিয়া দুই হাত দূরের জানালায়
রাখিয়া দুই ঠোঁট জোছনা পেয়ালায়
- তোমাকে বুনেছি ।

ভ্রমে আর ঘামে বালির মূরতি
যতনে এঁকেছি
 - তোমাকে খুঁজেছি ।

তুমি যে তুমি নয়- মায়া আর মরীচিকা,
অনিকেত প্রাণে এক ক্লান্ত পিপীলিকা;
                      - কেন যে ছুটেছি !


১৩.০৫.১৪
চট্টগ্রাম।



নাম


ডেকেছে  কলেমা - নীলমেঘ পাখি- রাতের আড়ালে, আবড়ালে জেগে
রেখেছো কি মনে ধূসর আকাশ - মার্বেল চোখ?

চোখের পেয়ালা জুড়ে যাকে এঁেক যাও - মেঘের আলোক মালায় রোজ খুঁজে যাও,
কখন সে সমুখে দাঁড়ায় দেখেও দেখো না -
তিরতির কাঁপে তবু ঠোঁটের যুগল নাও -সফেদ স্বেদের তসবিহ দানা নিমেষে চিবুকডাঙায়।

অথচ অচিন আমি- বেগানা পুরুষ নয়, নয় কোন আজনবি-আগন্তুক
হঠাৎ আমাকে দেখে নেচে ওঠে নীরব নাকফুল;
তোমার দুচোখ চেনে, তোমার  দুঠোঁট  চেনে - জানে বোঝে কপোলের বিন্দুবিন্দু ঘাম।
আঁখির ত্রিভুজ কোণে নিঃসঙ্গ রাতের খামে এখনো তো জেগে আছে আকাশের নাম!

জোছনাগজল

  

জিয়ল মাগুর মাছ কানা ঘাই মারে মাটির পাতিল ফুঁড়ে তারা বুদবুদ, তোমার কপোল তলে জেগে থাকে কোজাগরি চাঁদ -
চোখের ডানায় নেচে নেচে নেমে আসে ঢেউভাঙা  মুহুরির যুগল সাম্পান।

সহসা ভুলে যেতে থাকি - ঈশ্বরের চোখ, আক্রান্ত গজল, অভিশ্রুতি অপিনিহিতি।

বিশ্বাসের  বিষফল অকপটে খেয়ে নেচে নেচে গেয়ে যাই জোছনাগজল।

অচিন ময়নাপাখি, অদেখা ঈশ্বরী ডানা মেলে ছোটো - নক্ষত্রে বিলীন।
ভুল ভালো বাসার রঙসুর মেখে গড়ে খেলাঘর
আঠোরো পাঁপড়ি রাঙে নীল মেঘগাঙে, রাত জেগে গেয়ে যাই উর্ঘুম উলুকের গান।

শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০১৪

শকুন

আঁধারের সহোদর দুপুরের রোদ
                       কাঁপে কাকের ডানায়,
সারাটি জনম শুধু আগুনবারুদ গোলা;
প্রতিটি  জরায়ূ ভ্রূণে নেমেছে আঁধার-
                              যুদ্ধের উত্তরাধিকার।

পৃথিবীর চোখেমুখে বিবমিষা ঘুম; গোলাভরা ট্যাঙ্ক
অজগরের মত হাঁটে, স্কুলে মসজিদে রক্তের দাগ,
                বাদামি আলোয় আজ কাঁদছে অরুন;

কমলা রঙের রোদ যখন হৃদয়ে জাগে
শহরের পোড়া মুখ ভেসে যায় মায়ের আর্তস্বরে,
                           শিশুদের রক্তের ধারায়।

চারদিকে কাক আর ক্ষুধার্ত শকুন
              বিপন্ন পৃথিবী এক ভাগাড় বিশাল ।

আমাদের ঘরে আজ নেমেছে শকুন; সমুখে
নেপথ্যে তারা ডানা মেলে নাচে - নামছে মিছিল
                              ফের মড়ক-মৃত্যুর।

শুক্রবার, ২০ জুন, ২০১৪

যমজ আঁধার


তোমার কোমল হাত ছুঁয়ে গেছে ভোরের বাতাস, দুপুরের রোদ  সন্তর্পণে- একা,
তোমার অলকদাম ছড়িয়েছে বৈধব্য বিষাদ গান, বেহালা বিজন সুর;

বিপন্ন  বৈষ্ণব এক গেরুয়া আঁচল তার খুঁজে ফিরে মৃত্তিকার মুখ-
সায়াহ্নে নদীর তীর দূর অরণ্যের বাঁয়ে দুই চোখ তার।

কী মধুর সুরে যাদুর ছোঁয়ায় এঁকে গেছো তুমি দিন ও রাতের মুখ,
কেউ কি দেখেছে এই রুপোর চাঁদোয়া - বনপোড়া হরিণীর আদিম অভিসার!

আমিও মানুষ - ইচ্ছের ফানুসে উড়ে আর পুড়ে জোছনার সবটুকু গিলে গিলে খাই;
রেখে যাই আঁধারের শিস আর সুর - ভুলে যাই যতো পথ-পিদিম প্রহর।

রাতের বেদনা ভুলে নীরবে দাঁড়িয়ে ভাবো রোদপোড়া কাকতাড়ুয়া, একা;
ঈষাণে মেঘের নদী, তোমার ডানায় জমে আজো আষাঢ়ের যমজ আঁধার।

১৮.০৫.২০১৪







দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ ৩০ মে ২০১৪,
 দৈনিক সমকাল ১২জুন ২০১৪

বৃহস্পতিবার, ৫ জুন, ২০১৪

ছোটগল্প / আগন্তুক


-‘তুঁই আর বিষ্টিত ন ভিজিবা। ভিজা খঁড়ে ঘণ্টার ফর ঘণ্টা বারে ন হাডাইবা।’ কথাগুলো বলতে বলতে গত রাতে কাঁথাটা জড়িয়ে দিচ্ছিল জোছনা। তারপর কাঁথার নিচে দু’জনের চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে এক লহমায়।

রাতে এক দফা কাঁপুনি এসেছিল গায়ে। জোছনার কথাগুলো বার বার মনে পড়ে তার।

শনিবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৩

কবিতা- মাটির মুরুলি


ছায়াহীনতার ছায়া বাড়ে, মায়াহীনতায় মায়া কাঁদে। ছায়ার পেছনে ছুটি– বাতাসের ছায়াটুকু টুকরো টুকরো কাঁপে হ্রস্ব দীর্ঘ সবুজ বাদামি নীল ছায়া ভাঙে রাঙে; নিদাঘ দুপুর জুড়ে অপরাহ্নের কালো ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।

কায়ার সমুখেছুটি চপল হরিণ গীতল জোছনা ঘন বরষার বনে; ক্লান্ত স্বচ্ছ স্বেদে নীলকায়া ফোটে ; আষাঢ়ে রুবাই রচে কাসিদার পাতা –বাবুই বাসায় ঘিরে পাথুরে পিদিম রাত।

মায়াবতী নদী আনঘরে ভুলে সাহানা সেতারসুর –কায়ার কাহিনি জারুল পারুল আমলকি চাঁপা।

কোথায় তোমার ছায়া জানি না–দেখি না।
কোথায় তোমার কায়া দেখি না–জানি না ।

ইলিশ উড়াল দিলে মশা আর মাছি চুষে মরা রূপচাঁদা কাঠের খড়ম– মাটির মুরুলি কাঁদে।




১৬ আগস্ট, ২০১৩ইং
চট্টগ্রাম।

বৃহস্পতিবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৩

কবিতা - হিয়া এক টিয়া পাখি
















 

নীল পরি, ওগো দূরভাষী, সবুজ তোমার মন-পেলব পেয়ারা এক, রাতের পাতার ভেতর নিবিড় ছায়ার বনে নেচে নেচে বেড়ে ওঠা ভোরের বিভ্রম; সকাল তোমাকে দেখে, দুপুর আকাঙ্ক্ষা করে, বিকেল তোমাকে ডাকে-আরণ্যঅনাথ তুমি; তোমাকে বাঁচাতে পারে না শত শত গিটে - বাবামা, প্রেম ও পুরাণ, বাঁশও বেতের বেড়া, রোদবৃষ্টিছায়া ।

তোমার মঙ্গলমুখ বোঝে না পড়ে না বোশেখদুপুর, গনগনে রোদ- সংসার সহচর।

ভালোবেসে দূর নাফ নদী, অরণ্যকুটির কখনো পাঠায় যদি এক টুকরো নীলমেঘ- ডাকে যদি দ্বীপ সোনাদিয়া তুমি তাকে বোঝ না, তুমি তাকে চেনো না। না চেনার ভান করে বানভাসি হিয়া।  তবুও বাদল নামে- জুড়ায় তোমার শরীর নিদাঘ প্রহরে; আচানক রাত নামে উড়ে আসে অচেনা বাদুড়; দাঁত ও নখের দাগ, আড়চোখে হাসে- আধখাওয়া পেয়ারা পড়ে পুরোন কাবিন।

হিয়া এক টিয়া পাখি- খাঁচায় বাঁচে না সে; সংসারে  সঙ সেজে নাচে। ভালোবাসা এক ধ্রুব তারাফুল- বিনয়ে বিপন্ন জানি দ্রোহে দূরগামী।


২৮.০৮.২০১৩ ইং
চট্টগ্রাম।



সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৩

গল্প-অলৌকিক টেলিভিশন



    












 
আমরা একসঙ্গে  লাইব্রেরির পাশে এক চিলে কোটায় ছিলাম তিন বছর। আগের বারোটি বছর তিনি একা একা এ ঘরেই ছিলেন। আমাকে পেয়ে খুব সহজে আপন করে নেন, সব কথা আজ বার বার মনে পড়ছে, কেন পড়ছে কোন ক্রমেই বুঝতে পারছিনা। এগুলো মনে করে এখন কী হবে? কিন্তু মন তো মানে না -  মানানো যায় না। আচ্ছা, স্যার কী আমার কথা শোনেননি-  উনি তো আমাকে দেখতে এলেন না। মনে হয়- একটি বিশাল স্টেশনের নির্জন কামরায় একা একা বসে ভাবছি- এই সময়টা  বুঝি এমনই। ওই, চেয়ারটি কি এখনো খালি পড়ে আছে? ওই চেয়ারে প্রতিদিন আমি বসতাম । ওই চেয়ারে আর কেউ আর বসবে না, ওটি আমার চেয়ার- আমি নেই তো কে বসবে, কেউ বসবে না। অনেক দিন ধরে একমাত্র আমিই ওই চেয়ারে বসেছি; আমি না থাকলে এটি খালি থেকেছে। আচ্ছা, এখানে কি কেউ আছেন ওই কাঠের চেয়ারটা যিনি আমাকে এনে দেবেন। হেডমাষ্টারের সঙ্গে কোন কথা বলতে ইচ্ছে করে না। ধান্ধাবাজ, জোচ্চোর কোথাকার।
সাদিক সৈয়দ হেডমাস্টারকে বিশ্বাস করে না।
অদ্ভুত এক অচেনা শক্তি টগবগ করছে সারা গায়ে - কমনরুমের কোণার টেবিলটির তৃতীয় চেয়ারটির কথা বলছি । সেটিও হয়তো খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবো। চেয়ারটির ওপর কোন তোয়োলে নেই- ছিল না কখনো। তেমন আহা মরি কিছু নয় -  কাঁঠাল কাঠের পুরনো চেয়ার- হাতল দুটো ও পেছনের কাঁধাটা ঘামে ময়লায় চিটচিটে থাকতো সারা বছর। ওটি আমার  চেয়ার, খুব প্রিয়, এই চেয়ারের এক সময় হরলাল স্যার বসতেন। তিনি প্রমোশন নিয়ে চলে যাবার সময় ওটি আমাকে দিয়ে যান। এই চেয়ারের সম্মানটা বেশ আলাদা। এটি স্কুলের পুরাতন মাস্টারগণ  জানেন। হরলাল স্যারের চেয়ারেই বসে সাদিক সৈয়দ। প্রাক্তন ছাত্রদের যাঁরা আজ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার উকিল ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছেন- তাঁদের  মনে আছে। অনেকে আসেন- তাঁরা স্কুলের রেজাল্টের কথা বলেন, গোল্ড কাপ টুর্নামেন্টের কথা বলেন। হরলাল স্যারকে স্মরণ করেন- তাঁর কাঁঠাল গাছের চেয়ারের কথা বলেন।  স্যার এই স্কুলে আমাকেই একটু বেশি পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন। তিনিই আমাকে মিউজিক টিচার  হিসেবে এখানে নিয়োগ দিয়েছিলেন। স্যার শিল্পের ভক্ত-সমঝদার ছিলেন; ডি এল রায় আর অতুল প্রসাদের গানগুলো শুনলে তাঁর চোখ জোড়া ভিজে যেতো। কখনো কখনো চোখের জল গড়িয়ে পড়তো গণ্ড বেয়ে।
চারদিকে গুমোট অন্ধকার। চোখ দুটো ভারি বাটখারার মত সেঁটে আছে ধড়ের সঙ্গে অনড় পাথরপিণ্ড যেন। অকষ্মাৎ আজ আমার মনের দরজা জানালার সব কপাট খুলে গেল- সকালেও যা ভাবিনি। কোন বিষয় মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার অমিত শক্তিতে ছবি পর ছবি ভেসে উঠছে সামনের আলৌকিক টেলিভিশনে, স্মৃতিই এর রিমোট কন্ট্রোল, মুহূর্তের ভেতর শত শত চ্যানেলে অসংখ্য  চলমান ছবি। দেখছি আর ভাবছি। এই আমি  সবার হৃদয়ের স্মৃতি, বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনের কাছে এক অসামাজিক ব্যর্থ মানুষ, যে সময় বোঝেনি, সুযোগ খোঁজেনি, দামি গাড়ি, সুরম্য প্রাসাদ, পদ-পদবি আর খ্যাতির কোন তোয়াক্কা করেনি।  আমি আজ অন্য ভুবনে- সবাইকে দেখছি অশরীরী আত্মার অপার মহিমায়।  
ক্লাসরুমগুলো, লম্বা লম্বা বারান্দাগুলো, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দেবদারু মেহগনির সারি সারি গাছ - এখনো আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওই যে আমাদের কমনরুমের সামনে নারকেল গাছ দুটোর বাড়তি বুড়োমরা পাতা, যেগুলো শুকিয়ে গেছে কয়েক মাস আগে, এখনো অথচ ঝুলে আছে, থোরের শুকনো বাকল-সাকল ; যা আগামীকাল কালুর পরিস্কার করার কথা - ওটা কালুমিয়ার মনে থাকবে কি-না - এ নিয়ে জেগে থাকা সন্দেহটুকু বুকের ভেতর ক্ষণে ক্ষণে বেড়েই চলছে। 
শরীরের সাদা উর্দি মনটা ফুরফুরে করে দিচ্ছে - এক অচেনা পবিত্র অনুভবে ।
বার বার সুরা ইখলাস পড়ার চেষ্টা করছি, দরুদ শরিফ পড়ার চেষ্টা করছি, দোয়ায়ে ইউনুস পড়ার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। এখানে কোন ইবাদত বন্দেগির, দোয়া দরুদ পড়ার নিয়ম নাই। সওয়াল-জওয়াবে  কী বললো; কী বলবো না তা বুঝতে পারছিনা।  
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ Ñ জানাজা শেষে হুজুর ডানে- বামে মুখ ঘোরালেন; দুইদিকে সালাম জানালেন। মুসল্লিরাও হুজুরের মত ডানে-বামে ঘাড় ফিরিয়ে সালাম দিলেন। কাকে দিলেন কেন দিলেন কেউ তা ভাবে না। হয়তো ফেরেশতাদের দিলেন। এখন এখানে কয়জন ফেরেশতা আছে তা কেউ জানে না। এদের দেখা যায় না, কীভাবে জানবে। কিন্তু আমি জানি, আমি আমার আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের দেখছি, অন্যান্য সবাইকেও দেখছি; ফেরেশতাদের দেখছি। হায় হুজুর, আজও যথারীতি জিজ্ঞেস করলেন Ñ লোকটি কেমন ছিলেন ? ভালো ছিলেন, খুব ভালো ছিলেনÑ সকলের সমস্বরে উত্তর। আজও আমি চুপ থাকতাম। আমার  মন কখনো এ সবে সায় দেয়নি। আমি বুঝি না  জানাজার মাঠে কারো চরিত্রের সনদ দিলে কোন গোনাহ  কীভাবে মাফ হয়ে যায় । আজাব আসান হয়।
আজ আমি নীরব নিস্তব্ধÑতন্দ্রানিদ্রার মাঝামাঝি অচেতন।  
২.
বিশাল অডিটরিয়াম, পুরোপুরি ফাঁকা, কোন ছাত্রছাত্রী নেই, কয়েক বছর ধরে এটিই এখন চল হয়ে গেছে, মঞ্চে সভাপতি  অতিথিদের নিয়ে বসে আছেন। সভাপতির চেয়ারটি বেশ উঁচু, বড়োসড়োÑ দামি তোয়ালে দিয়ে ঢাকা। পেছনে ঝুলছে শোক দিবসের কালো রঙের ডিজিটাল ব্যানার, সবার বুকে কালো ব্যাচ। সামনে বিশ-বাইশজন অনিচ্ছুক শ্রোতা, একটু পর পর কথা বলছে, খবরের কাগজ পড়ছে,  মুঠোফোনে ফেসবুকে ঘুরছে,  হাই তুলছে, কারো আকর্ষণ অনুরাগ নেই, সবাই সব কিছু ভুলে গেছে। কিন্তু আমি কোন কিছু ভুলতে পারছি না, পারিনি। বুকের ভেতর দগদগে দাগটা এখনো খুনঝরা কাটা মাংশপি-ের মতো জ্বলছে। এটি একটি মঞ্চ নাটক  ছাড়া তেমন কিছু নয়।
সক্রিয় ক্যামেরাম্যান - ক্লিক ক্লিক ক্লিক শব্দ হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর। ছবিগুলো খুব দরকার, অন্যকিছু নয়। আলোচনা-মূল্যায়ন গৌণ। কাগজটি আগে থেকে তৈরি থাকে- যা কিছুক্ষণ পরেই বিভিন্ন মিডিয়ায় চলে যাবে। প্রেসবিজ্ঞপ্তি।  
ক্যাম্পাসে হাজার দুয়েক ছাত্রছাত্রী নিজেদের মত ব্যস্ত, কেউ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গালগল্প করছে, কেউ বা নানা জাতের গাছের ঘন ছায়ার নিচে, কেউ কেউ বিভিন্ন ক্লাস রুমে। কয়েকজন ছাত্রী শিউলিতলায় ঝরা ফুলগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে খবরের কাগজের ওপর রাখছে; আজ রঙ্গনফুলের গাছগুলো ফুল ফুলে ভরে আছে- ডালে-পাতায় যেন ছোপ ছোপ রক্তের দলা। ওদিকে চোখ পড়লেই আমার মনটা গভীর বিষাদে ভরে ওঠে।
কুরআন, গীতা ও ত্রিপিটক পাঠ শেষে বক্তারা আলোচনা করে যাচ্ছেন। সবাই বিসমিল্লাহ হির রাহমানির রাহিম বলে আলোচনা শুরু করছেন । আমি ভাবছি আর ঘামছি। আমি জানি- যাঁর স্মরণে-সম্মানে এ শোক সভা তিনি কখনো বিসমিল্লাাহ বলে কোন ভাষণ শুরু করেননি। মঞ্চে উপবিষ্ট অমুসলিম অতিথিরা  বেশ নীরব- তাঁরা এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন না। আজ অনেকেই অ্যাবসেন্ট। কয়েকজন মুখ গোমড়া করে বসে আছে। পেছনের সারির এক কোণায় বসে বসে এসব হিবিজিবি ভাবছি। অকারণে ভাবাভাবির কাজটা আমার সারা জনমের। সভা শেষ প্রায়। আমার বক্তব্য দেয়ারও সুযোগ নেই। থাকবে কি করে আমি তো সৈয়দ বংশের কলঙ্ক - গান পাগল মাুনষ; দেশের কথা বলে , মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে মানি লোকদের হেয় করাই নাকি আমার প্রধান কাজ। মাথার চুলগুলো কাশফুলের মতো সাদাÑ নামাজ দোয়া নেই, মসজিদ-মাদ্রাসায় কখনো পা দিই না। আমাকে ছেলে বুড়ো পছন্দ করবে কী করে।  মনে পড়ে- যখন আলিয়া মাদ্রাসায় পড়তাম হামদ-নাত গাইতে গাইতে সঙ্গীতের ভালোবাসায় জড়িয়ে যাই।
কেউ কেউ বলে- সাদিক মিয়া ঠোঁট কাটা; হাটে হাড়ি ভেঙ্গে দেয়া তাঁর স্বভাব। মোটা বুদ্ধি - মেপে কথা বলতে জানে না, সুবিধা-অসুবিধা বোঝে না। খামোখা  হক কথা বলে, বিপদ ডেকে আনে। 
চার পাঁচ জন বক্তা আলোচনা করলেন - ওরা হেডমাস্টারের আপন মানুষ। সবাই সুবিধেভোগী  মাস্টার। কেউ কেউ শহিদদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন। কিন্তু কাদের হাতে কীভাবে কে কে শহিদ হলেন কেউ বললেন না। 
ভালোবাসার স্পর্শহীন  ফাঁকাবুলি - দায়সারা কথার ফুলঝুরি আমার ভালো লাগে না। 
প্রধান অতিথির পালা। বিসমিল্লাহ হির রাহমানির রাহিম। একটু নরম সুরে আলোচনা শুরু করলেন। ‘ইতিহাস খুবই নির্মম। প্রতিটি ব্যক্তি যাঁর জায়গা তিনিই পেয়ে যাবেন -তা ঘোষণা করেছিলেন। শহিদ রাষ্ট্রপতি কখনো বলেন নাই তিনি স্বাধীনতার ঘোষক।’- এইটুকু বলে একবার সভাপতির দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ জোড়া বন্ধ- অতি উঁচু চেয়ারে বসে বসে তিনি ঝিমুচ্ছেন আর ঘুমুচ্ছেন। এটি তাঁর খুব শখের চেয়ার - অফিসরুমে এ চেয়ারেই তিনি বসেন। কোন অনুষ্ঠান হলে অডিটরিয়ামে বা খেলার মাঠে এটি নিয়ে যেতে হয়। নইলে নাখোশ হন। এক গ্লাস পানি মুখে ঢেলে ঢোক গিলেন এবং আবার বললেন- ‘নিয়তির নির্মম পরিহাস পঁচাত্তুরের এই দিনে বঙ্গবন্ধু অপঘাতে (!) মৃত্যু বরণ করেন।’
‘না না এটি পরিকল্পিত হত্যাকা-- কোন অপঘাত বা দুর্ঘটনা নয়। এ কথা আমি মানি না। এটি নির্জলা মিথ্যাচার। মিথ্যাবাদী - মিছাখোর কোথাকার।’-বুকের তীব্র ব্যথায় পেছনের চেয়ারে ঢলে পড়ি। 
ইমার্জেন্সির ডাক্তারগণ আমার নাড়ি দেখছেন। বুকের ওপর দুই হাত রেখে জোরে জোরে চাপ দিচ্ছেন ; ধীরে ধীরে বিমর্ষ হয়ে পড়ছেন। একজন জানতে চাইলেন - কী ব্যাপার স্যারের কী হয়েছিল? 
পদ্মপুকুর পাড়া কবরস্থান - শাকের, রবিউল ও মাস্টার তাহের তখনো কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। শাকের কোন ভাবে মানতে পারে না মাস্টার আর বেঁচে নেই। সাদিক সৈয়দ তো ট্রলির ওপর ঘুমিয়ে আছেন।  
৩.
ঘুম ভেঙ্গে গেল, আড়মোড়া ভেঙ্গে হাই তুলি, একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই, এই অন্ধকার প্রকোষ্টের ভেতর আলো-জোছনার এক মায়াবী খেলায় নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করি। দূর থেকে এক অপূর্ব সুর যেন ভেসে আসছে। এটি কি কোন নদীর কুলকুল ধ্বনি না কোন সঙ্গীতের কোমল ধারা ? এক অচেনা আনন্দে মনটা নেচে উঠছে, সেই কাঁঠাল কাঠের চেয়ারে বসে আছি, চোখে মুখে তৃপ্তির আবেশ; আমি অভিভূত হয়ে পড়ি, চেয়ারটি বেশ ঝকঝকে যেন এখনই বার্নিশ করা । একটু পরে মুনকির-নকিরের মুখোমুখি হবো, আমি তৈরি হতে চেষ্টা করছি - আমি সাদিক সৈয়দ, আমি মুসলমান, আমি বাঙালি ... ...। 
হঠাৎ কয়েকটি আওয়াজ তিনি শুনতে পাই; কেউ যেন জানতে চাইলেন - স্যার, আপনি কেমন আছেন ? আপনার এই মৃত্যুর জন্য কে দায়ী ?  আমি উত্তর দেবারর আগেই অন্যজন তাঁকে থামিয়ে দেন - না, এসব  প্রয়োজন নেই, আপনি রেস্ট নিন। এগুলো আমাদের ডেইলি রিপোর্টে আছে।

কয়েকজন মানুষ হাউমাউ করে কাঁদছে; তীব্র আর্তনাদ। কণ্ঠগুলো বেশ পরিচিত মনে হলো। আস্তে আস্তে ঘরের আলো বাড়তে থাকে। হ্যাঁ, তারা পরিচিত। একটু দূরে কয়েকজন বন্দি পড়ে আছে। চোহারাগুলো দেখা যাচ্ছে না। শক্ত দড়ি দিয়ে পিঠমোড়া বাঁধা। হাতগুলো পেছনে ঘোরানো কব্জি বরাবর শক্ত রশির মরা গিটে।  মাথামুণ্ডু থেতলানো - শরীর থেকে বেয়ে আসছে লাল রক্তের ধারা।


২৪.০৮.২০১৩ ইং
চট্টগ্রাম  

সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৩

কবিতা- উজালা হাপর



                       










দূরের আকাশে তোমার আঁচল উড়ে- জলের জৌলুশে ছায়াপথে অথবা মায়াবী রোদের ডানায়; লাটিমের মতো ঘুরে ঘুরে আমার সামনে দাঁড়ায়- বিকেল আবিরে রাঙে রাধাচূড়া পাখি।
তুমি কি জান না হায়- মগ্ন নীরবতা নয়, শ্মশান মাতম নয়, মৃত্যু এক অচেনা অধীর সুখপাখি;  আকাশ নক্ষত্র চিনে, জানে তাকে রোদপোড়া দূর দরিয়ার গাঙ কবুতর
আমাকে আড়াল করে কেউ কি রেখেছে তবে কয়েক টুকরো ভোর, বিহঙ্গ উড়াল তোমার জানালা পাশে !


শর্ত নয় ,স্বার্থ নয়, নয় কোন সোনার মোহর- জীবন ভোরের নদী, দেউলিয়া চাঁদ, লালনীল উজালা হাঁপর এক আগুনের ঘর









১৭ আগস্ট, ২০১৩ ইং; 
চট্টগ্রাম।