শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৫

মরমিদুপুর

// মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ


সদ্যপ্রয়াত কথাশিল্পী কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে

গলুইয়ে নিত্য বসে দাঁড় টেনে যাই_করুণকিসতি দোলে কথায় তারায়;
পুরনো নীলাভ সুতোয় বুনেছি সেতারশোলক
                                        আবিরের রঙে লাল হৃদয়মাজার।
বোশেখ ফুরোল রোদে আষাঢ়ের সুরে নাচে মেঘলামৃণাল,
নরম মাটির প্রাণে মুরুলিপ্রদীপ হাতে খুঁজেছি আমরা ওই অভেদসাকিন_
লহুর মোহনমায়া লাগিল রজনী শেষে ওই বুঝি ভোর হয় আঁধার আরশি ভাঙে
                                                 সহসা বাতাসে বাজে আখেরিনূপুর।
তোমার 'কথা'রা ফোটে_ উজালা মোতির মালা_ওই সব ছবি হাসে ফাগুনপাতায়,
এ কোন 'কমলনামা' টানিয়া মায়ার জাল কলবের কোলে হাসে মরমিদুপুর!


দৈনিক সমকাল/ কালের খেয়া ১০.০৪.১৫ইং
http://www.samakal.net/2015/04/10/130140

মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৪

জল ও কাজল



ইলিশ চন্দন বাবুই দূর অভিবাসী―মরুর মায়ায় ছোটে মেঘনাওনদী
শাদাকালোা পাখি দলিত দোয়েল তাকায় পেছনে ফিরে,
আমার গানের পাখি ভোলে ডাকাডাকি―গোধূলির ঘরে বাজে মহুয়ার পালা;
শিস তার আজ বিষ ফিসফিস বুকের বিবরে বাজে অচিন আয়াত,
বিরান বারান্দা জুড়ে ক্ষরণের ঘূণ―
গুলতির চোট এক গলায় গেঁথেছে দুপুরের গানে ভাঙে রোদের রেহেল ।

ঘরোয়া গানের পাখি―পেয়ারার পেটে বেয়ে নেমে এলো হলুদ বিকেল,
স্মৃতির ছিলিম ভরে ধূসর পানসি এক সমুখে দাঁড়ায়;                                                                                           আঁধারের যোনি ছিঁড়ে নদী তিরতির―জল ও কাজল পোড়ে ভাটির ডাঙায় ।

বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট, ২০১৪

পান আর নুনের কসম

টোলপড়া দিঘির গম্ভীর বুকে শাপলায় জ্বলে পোড়ে আগস্টআগুন;
তোমার রক্তাভ পাঞ্জাবির গায়ে ঝুলে আছে বিমূঢ় স্বদেশ-নৌকার
মাস্তুল, তালি লাগা পাল;কৃষকের ভাঙা চোয়ালচিবুক, নালি জমি,
লাঙল জোয়াল- কাপুরুষ স্বাপদেরা ঢের তড়পায়;
বুনো মেঘবাড়ি ঘৃণার মিনার- জ্বলে ওঠে খড়ের গম্বুজ।

দুগ্ধবতী গাভির হলুদ ওলান আর নীলবাছুরের দোহাই - সহসা বধিব
বাকি বদরশকুন; ইনানি সৈকত, পান আর নুনের কসম-
সবুজজমিন, হরিৎপতাকা,পদ্মা আর যমুনায় হাসে জনকের প্রাণ।

কারখানার চিমনি তুমি অযূত আঁধার ভেঙে দাঁড়িয়ে রয়েছো ঠায়-
                                        দূরগামী আলোকরাডার.....


০৬.০৭.২০১৪ ইং চট্টগ্রাম।

সোমবার, ৪ আগস্ট, ২০১৪

গল্প: তিন গুলির হুকুম



নয়টার কাছাকাছি। এক মধ্যবয়সি দম্পতি আমানত শা’র মাজারে এসে পৌঁছোয়। ভদ্রমহিলার পরনে তাঁতের নীলাভ শাড়ি- মাথা, বাহু, হাত ঢাকা। ভদ্রলোক সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা- মাজারের এতিমখানার খাদেম জাফরহুজুর তাঁদের দেখে এগিয়ে আসেন; সালাম দেন ।

হুজুর তাঁদের খাস কামরায় নিয়ে যান।

- বলুন, কেমন আছেন?  আপনারা কোত্থেকে এসেছেন।

-হুজুর আমরা বাঁশখালি-নাপোড়া থেকে এসেছি। একটি বিশেষ অনুরোধ আছে আমাদের।

-বলুন, আমি আপনাদের কী খেদমত করতে পারি?  ভাই বলুন।

-আপনি অনুমতি দিলে আমরা এই এতিম শিশুদের এক বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে চাই ।

-আলহামদুলিল্লাহ। আমি ব্যবস্থা করছি বলে তিনি মৃদু হাসেন; আর ডান হাত গোঁফ বরাবর তুলে কাঁচা পাকা দাড়ির উপর কয়েকবার বোলালেন।

তসবির দানাগুলো সাদা আঙুরের মত জ্বলছে টেবিলের উপর । বলপেনটি হাতে নেন তিনি । এতিমখানার ছাত্রশিক কর্মচারী সংখ্যা গোনেন- পাঁচ আঙুলের দাগে বুড়ো আঙুল রেখে রেখে- একশত এগার জন। ড্রয়ার টেনে দুটি মেন্যু বের করে দেখান-সাশ্রয়ী ও শৌখিন। কোন একটি বেছে নিতে বলেন। দুইজন কর্মচারী নিয়ে তাঁরা রিয়াজুদ্দিন বাজারে পাঠান।  খাবার দাবারের ব্যবস্থা  করেন। তাঁরা আপ্যায়ন পর্ব শেষে মেজোভাই মৌলানা নুরুল ইসলামের জন্যে দোয়া চান। আজ তাঁর চল্লিশতম মৃত্যুবার্ষিকী। মুনাজাতে তাঁরাও হাত ওঠান; শরিক হন। দোয়া শেষে দুজনে হুজুরের সামনে দাঁড়ালেন; হুজুর, বেয়াদবি মাফ করবেন ? আমরা অমুসলিম। আমি দিলীপ কুমার দে ও শশীরানি ; আমার স্ত্রী।

দুই.

নুরুল ইসলাম মায়াবিবির একমাত্র সন্তান। আশে পাশের কয়েকটি গ্রামে তিনি ‘মেজোভাই’ হিসেবে বেশি পরিচিত। গ্রামের মুরুব্বি মামা আবদুল কাদির তাঁর ছেলেমেয়েদের নুরুকে ‘মেজোভাই’ বলে ডাকতে শেখান। এই সূত্র ধরে  গ্রামের হিন্দুদের অনেকেই তাঁকে ‘মেজোদা’ বলেই ডাকেন।  নুরুর জন্মের তের দিনের মাথায় বাবা মৌলানা শফিকুল্লাহ মারা যান। মামা আবদুল কাদির নিজ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তাকেও ‘মানুষ’ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাড়ার মকতব শেষ করে নুরু যখন ষোলশহর সুন্নিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয় তখন তার দুই মামাতোভাইসহ পাড়ার কেউ কেউ মহসিন কলেজে আসতে শুরু করেছে? সাধন মুহুরিও তখন একই মহল্লায় মামার বাসায় থেকে কলেজে পড়েন; আর  প্রতিবেশি শিশু দিলীপকে অঙ্ক-ইংরেজি পড়ায়। স্বল্পভাষী সাধন খুব সহজে নুরুল ইসলামের দ"ষ্টি আকর্ষণ করে। নুরুর বাবা নেই, তাঁকে সে দেখেনি? মামার বাড়িতে আশ্রিতা তার মা। কুরআন, হাদিস ও আরবির পাশাপাশি বাংলা-ইংরেজির প্রতিও তার আগ্রহ জন্মে? বন্ধু সাধনের সাহচর্যে। সে ফাজিল শ্রেণিতে উর্দুর বদলে ইংরেজি নেয়। মামা ব্যাপারটি মেনে নিতে পারে না। কুরআন হাদিসের সঙ্গে বাংলা ইংরেজি পড়ে যদি ছেলে দ্বীনের খাদেম হতে পারে তাতে মায়ের আপত্তি নেই; আপত্তিটা মামার। নুরুকে র্উদু-ফারসিই পড়তে হবে- আধুনিক শিার দরকার নেই তার ।

খন্দকার রমিজুদ্দি বেশ আছে। মসজিদে যায়? আজান দেয়। মকতবে ছেলেমেয়েদের আরবি পড়ায়; নামাজ-কালাম, দোয়া-দর"দ শেখায়। তালেব মেম্বারের বাড়িতে খায়; দেউড়িতে ঘুমায়। কখনো-সখনো কেউ ডাক পাড়লে গৃহস্থের বাড়ি যায়- বিপদে-আপদে দোয়াপড়া দেয়, পানিপড়া দেয়, তাবিজতুমার করে। জিনপরির আছর, ভূতের ভয় তাড়ায় - সোলেমানি চিকিৎসায় তাঁর প্রসার পরিচিতি গ্রাম জুড়ে। সে বাংলা জানে না। উর্দু বলতে পারে । মাথায় পাগড়ি চেপে লম্বা কুরতা পরে যখন পাড়া-পাড়া গলিতে গলিতে হাঁটে ছেলে বুড়ো সবাই তাকে বেশ কদর করে। সালাম করে মুলাকাত করেন। তখন তার বেশ ভালো লাগে। স্কুলমুখো ছেলেমেয়েগুলো ভালো লাগে না? মৌলানা নুরুল ইসলামকে সে একদম সহ্য করতে পারে না। সে বলে বেড়ায়? দাড়ি রাখলে কেউ আলেম হয় না- নুরুল ইসলাম হক্কানি আলেম নয়; একজন মডার্ন মৌলানা। সে ইংরেজি কাগজ পড়ে, হিন্দু-বৌদ্ধদের সঙ্গে বসে আড্ডা মারে। তাই খন্দকার প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি যায়, দ্বীনের দাওয়াত দেয়? ইমান আকিদার বয়ান করে। তখন তার দিলের ভেতর ইমানের রোশনাই ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

নুরুল ইসলাম জানতে পারেন মুসাদ্দিকাকে স্কুলে সবাই মিতা বলেই ডাকছে। প্রথমে তা শশীর মুখে শোনেন; এটি মা ছেলেকে জানালেও নুরুল ইসলাম তা তেমন আমলে নেননি। তিনি মেয়েকে প্রাইমারি শেষে কেন হাইস্কুলে পাঠিয়েছেন এলাকায় তা অনেকের বেদনার কারণ । মিতু মায়ের তদারকি ও ভালোবাসায় বেশ এগিয়েছে- শিক্ষকদের স্নেহ আর স্বীকৃতি তাকে পড়ালেখায় বেশ অনুরাগী করে তুলেছে।

তিন.

কয়েক মাস ধরে এক অচেনা আতঙ্কে বানিয়াকাটা কাঁপছে। কাঁপছে পাশের আরো দুই গ্রাম? হরিয়ারছড়া ও পুঁইছড়া। হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রাম দুটোয় কয়েক শত নারীপুর"ষের বসবাস । এই তিন গ্রামের মানুষ সবাই একই বাজারে সকালসন্ধ্যা কেনাকাটা করে, একই স্কুলে ছেলেমেয়েদের পড়লেখা করতে পাঠায় আবার একই ওয়ার্ডের ভোটার বলে মিলে মিশে মেম্বার-চেয়ারম্যান নির্বাচন করে। এমন কি তাঁদের ভোট কেন্দ্রও একটি। তবে ধর্ম তাঁদের আলাদা।

পাড়ার বাড়িঘর দিনদিন পুর"ষশূন্য হতে শুরু করেছে। শিশু, নারী  আর বুড়োরা অনেকটা অনাথের মত অপোয় থাকেন। কখন কী করতে হবে, কোথায় পালাতে হবে? তা কেউ জানে না, বোঝে না। দেশের মানুষ এখন দুই ভাগে বিভক্ত? পাকিস্তানবাদী ও  স্বাধীনতাপন্থী। পাকিস্তানরা পাকজমিনের হক আদায়ে মরিয়া? অখণ্ড পাকিস্তান রার শপথে মশগুল, ধর্ম তাঁদের প্রধান অস্ত্র ; স্বাধীনতাপন্থীরা দেশের স্বাধীনতা চায়? বৈষম্যহীন সমাজপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নে-মন্ত্রে  নিবেদিত; ‘জয় বাংলা’ তাঁদের শক্তি ও প্রেরণার উৎস। দেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর এই ভেদরেখা আরো বিশাল হতে শুর" করেছে। মুসলিমলীগের পাকিস্তান লোকজন পাড়ায় পাড়ায় ঘরে ঘরে দালাল নিযুক্ত করেছে? প্রতিটি মানুষের ছায়ার সঙ্গে মিশে আছে এই টিকটিকির দল ।

নুরুল ইসলাম মায়ের চিকিৎসার জন্যে জেলা সদরে ছিলেন? বাড়ি ফিরেন সন্ধ্যায়। বিষয়টি তিনি শুনে নির্বাক। বাবু গত নির্বাচনে তালেব মিয়ার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন? সৎ সাহসী নিপাট ভদ্রলোক নাথবাবু এলাকার হিন্দু মুসলমানদের দলাদলির উর্ধে থাকেন। হিন্দুদের পাশাপাশি পাড়ার সাধারণ মুসলমানরাও তাঁকে পছন্দ করতো। এটি তালেব মিয়া কখনো সহ্য করতে পারেননি। এই সুযোগে সে তাঁর চেলাচামুণ্ডা নিয়ে প্রেমনাথবাবুকে জবাই করে খুন করে? চিকচিকে রামদা হাতে খন্দকার রমিজুদ্দি তাঁর পেছন পেছন ছুটে। লাশটি কালিবাড়ির সামনে ফেলে রাখে। শেয়াল কুকুরের কামড়ে শরীরের  হাড়মাংশের বিভিন্ন খণ্ড রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়; পঁচেগলে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে।

শশী আর মিতা তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। শশীর মা উষারানিও মিতার বাবার স্কুলছাত্রী ছিলেন। শশীর স্কুলে যাবার পথে মিতাদের বাড়ি-  দুজনেই বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। বিএসসি স্যার দিলীপবাবু তাদের এক মাত্র ভরসা। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে স্যার স্যার বলে মিতু হরহামেশা দিলীপ বাবুর পেছনে পেছনে ছুটোছুটি করছে- শশী কয়েকদিন ধরে বিষয়টি খেয়াল করছে; তেমন গায়ে মাখেনি। হঠাৎ মিতুর অঙ্ক খাতার প"ষ্টা উল্টাতে গিয়ে সে দেখে একটি বাক্য ; ‘মিতু, তুমি এখন দিলীপ দিওয়ানা’। এইভাবে দুইবান্ধবী জড়িয়ে পড়ে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতায়?প্রণয়ে ও পাঠে। কিন্তু সতর্ক শশী কখনো তা মিতুকে বুঝতে দেয়নি। অন্যদিকে সে সরাসরি ভালোবাসার আকুতি জানিয়ে দিলীপবাবুকে চিঠি লিখে। মিতুই ছিল তর"ণ দিলীপবাবুর পছন্দের শীর্ষে । সাধনমুহুরি তাঁর পাত্রী তালাশে পুরো তল্লাট যে চষে বেড়া"েছ তা হুজুরস্যারেরও অজানা নয়। স্কুল জীবনের গেল চার বছর এভাবেই কেটেছে-  কখনো শশী, কখনো মিতা ফার্স্ট হয়েছে। শশীর মা, ও শশীর মা উড, তরাতরি উড। শশীরে ডাক। তরাতরি উড-  উষারানি সঙ্গে সঙ্গে উঠে মেয়ে শশীকে জাগায়, নিশিকে জাগায়।

মাঝ রাতে সাধন মুহুরির আচমকা ডাক শোনার সঙ্গে সঙ্গে  ঘুম ভাঙ্গে তাঁদের। তাঁরা বুঝতে পারে আর নিস্তার নেই- রেহাই নেই; এবার পালাতে হবে কোথায় পালাবে কীভাবে পালাবে কোন কূলকিনারা খুঁজে পায় না উষারানি। আরো দুজন আমবনের ঘন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে?হাশেম আর সিদ্দিক। সাধনমুহুরি হাশেমের হাতে শশীকে তুলে দেয়, এক কাপড়ে- ভয়ে উৎকণ্ঠায় নীল উষারানি নিশির হাত ধরে কাঁপছে, কাঁদছে। নিশি তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী।

মৌলানা নুরুল ইসলাম-বানিয়াকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক-  হুজুরস্যার। এখন একমাত্র ভরসা। আশে পাশের কয়েকটি গ্রামের হিন্দু মুসলমান তাঁর বাড়িতে আসে; বুদ্ধিভরসা খোঁজে। ফজরের নামাজের পূর্বে যখন পূর্ব দিগন্তে- আলোর রেখা ফুটতে থাকে, তখনই তাঁর বাড়ির উঠানে, পুকুরের পাড়ে নানা বয়সের লোকজন অপো করতে থাকে?কৌতূহলী রমিজুদ্দির বিষয়টি সবার আগে চোখে পড়ে; সে তালেব মেম্বারকে বলে। মাঝে মাঝে আজনবি লোকজনও তাঁর কাছে আসে। এটি অনেকের জানা; তারপরও কেউ কিছু বলে না।
হাশেম মধ্যরাতে শশীকে নিয়ে বানিয়াকাটা আসেন। মায়াবিবি ওকে নিজ সন্তানের মত স্নেহভরে গ্রহণ করেন এবং তাঁরা বিছানায় এক সঙ্গে ঘুমান; মিতু জানে না পাশে এখন কে শুয়ে আছে। প্রিয় স্কুলটি বন্ধ অনেক আগেই। শশীর পুরো শরীর এখনো কাঁপছে। মায়ের কথা মনে পড়ে; বারবার নিশির কথা মনে পড়ে। এক অনিশ্চিত আগামীর দিকে তারা ছুটে চলছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তাদের গ্রামেও। চেনাজানা এই মানুষগুলো হঠাৎ করে বদলে গেছে, এখন সবাই যেন শুধু মুসলমান-মানুষ নয়। অনেকে মুসলামান হ"েছ। মুসলমান হতে হয় প্রাণের ভয়ে?অনি"ছায়। জীবনের চেয়ে ধর্ম বড় নয়। তাঁরা নাম বদলায়, দাড়ি রাখে, ‘কলেমা’ শেখে। কিন্তু  হুজুরস্যার আগের মতই একান্ত- আপন, গভীর-গম্ভীর-চিন্তশীল অন্যরকম মানুষ। সারা রাত জেগে থাকেন রেডিওটি তাঁর নিত্যসঙ্গী, প্রিয় আকাশবাণী, প্রিয় স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র। সে ভাবে? দিলীপস্যার  কী জানেন তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে?  স্যারের সঙ্গে কী আর কখনো দেখা হবে না

চার.

মায়াবিবির ঘুম আসে না। তাঁর মুনাজাত দিন দিন দীর্ঘ হতে থাকে। পুত্রবধূ মুহসিনার মুখখানি ধীরে ধীরে ম্লান হতে হতে শুকিয়ে যাচ্ছে। বেয়াই মুফতি সাহেব পাশের ইউনিয়নের শান্তি-কমিটির চেয়ারম্যান; বেশ ব্যস্ত - প্রতিদিন তিনি থানাঅফিসে যান এলাকার শান্তি- শৃংখলার রিপোর্ট দেন, পরিবেশ পরিস্থি'তি তদারকি করেন। আবার নুরুর বক্তব্য আলাদা, সে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখে- শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার মূলমন্ত্র তাঁর হৃদয়ে; ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে তাঁর। এশার নামাজের পর ছেলেকে ডেকে একান্তে- বসেন-

_ নুরু, অফুত; আঁই খত খতা উনির। তোরে ত ইতারা ন রাকিব। মারি ফেলাইব।

- না, মা । অনে নডরাইয়ন? আল্লা দিলে আঁর কিছু নঅইব। অনে একটু খাস দিলে দোয়া গইরগন। অনে ত জানন, আল্লা এত্তো জুলুম খুন, জালন-পোড়ন খন দিন নশইব।

- অফুত, আঁই বউর খাদানি, নাতির খাদানি আর শইত নফারির। তুই ইবার মা বাফরে খবর দে। ইবার একখান ব্যবস্থা গর। আঁত্তুন শরম লাগে- খত জনে আজেবাজে খত খতা খয়।

- ঠিক আছে, মা। অনে নডরাইয়ন; আঁর ফোয়াচারে দোয়া গইরগন। আঁই একখান ব্যবস্থা গরির। দুই একখান দিন সময় দন।

-এদিন্না রাহেলা খদ্দে তোর উয়র বলে তিন গুলির উকুম হইয়ে। মায়াবিবি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেন- তাঁর এই কান্না আর থামে না।

নুরুল ইসলাম বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবেন । শশীকে কীভাবে অন্য কোথায় রাখা যায়। নিজে একজন আলেম বলে তাঁকে অনেকে সম্মান করেন, ভালোবাসেন; তাঁর কাছে শশী আশ্রয় নেবে এটা কেউ হয়তো ভাববে না। কিন্তু তাঁরও তো শত্রু আছে, আছে স্বাধীনতার শত্রু, দেশের শত্রু। তিনিই শুধু জানেন শশীর বাবামা কোথায় লুকিয়ে আছেন। এখন হরিয়ারছড়া ও পুইছড়ার বাড়িঘর শূন্য-সবাই জিনিসপত্র বড় বড় গর্ত খুঁড়ে কিছু মাটির নিচে আর কিছু পুকুরের তলায় লুকিয়ে রেখে পাহাড়ের জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে । যে কোন মুহূর্তে হানাদার বাহিনীর আক্রমণে গ্রামগুলো ভস্মীভূত হয়ে যাবে।

গভীর রাত। জামগাছের ডালে হুতোমপেঁচাটি আজো ডাকছে এক অলুনে কণ্ঠে। এ কী কোন পাখির ডাক, না আঁধার উপত্যকায় মৃত্যুর পদধ্বনি; পলে পলে প্রলম্বিত হয়েছে নীল আতঙ্কের দীর্ঘ অপ"ছায়া। ল্যাম্পের  টিমটিমে আলোয় ভেজা চোখে মুহসিনা শশীকে বোরকা পরিয়ে দিচ্ছেন, শশীর ডান হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন মায়াবিবি। এক পাথর মূর্তি যেন ঠায় দাঁড়িয়ে- এই ছয় মাস সে বেশ নিরাপদে-নিভৃতে কাটিয়েছে এখানে। মিতু অস্ফুটস্বরে কাঁদছে ; মাঝে মাঝে ঢুকরে ওঠছে সে।

হুজুরস্যার পাড়ার দক্ষিণপ্রান্তের প্রবেশপথে একা দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছেন। হাশেম ও সিদ্দিক শশীকে নিয়ে রাতের আঁধারে শাপলারবিল দিয়ে দ্রুত ছুটছেন। নদীরঘাটে সাধনমুহুরির হাতে তারা শশীকে তুলে দেবে- দিলীপবাবু নৌকার গলুইয়ে বসে অপক্ষা করছেন। নৌকা ছেড়ে দেয়- জোছনা মাখা চাঁদ চুয়ে চুয়ে নদীর ঢেউয়ে লুটিয়ে পড়ছে; রুপোলি জলের ধারা নীল নত্রের দিকে তাকিয়ে ছলাত ছলাত স্বরে হাসিতে ফেটে পড়ছে।

পরদিন এশার নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছেন তিনি- ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ এই শ্লোগানে আকাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠছে; অদূরে পুঁইছড়ার কমলহরি মহাজনের বাড়িটি দাউদাউ করে জ্বলছে, জ্বলছে মাটি, জ্বলছে আকাশ। নারীপুরুষের আর্তনাদ-  আগুনের কালো ধোঁয়ায় রাতের বাতাস ভারি হয়ে ওঠেছে।

ঘুটঘুটে অন্ধকার। পেছনে হঠাৎ গুলির শব্দ- রক্তাক্ত শরীরে নুরুল ইসলাম মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
নৌকোটি এখনও মাঝ দরিয়ায়- অন্ধকারের নিকষ গহ্বরে উথালপাতাল ঢেউ ভেঙ্গে ছুটছে। পূর্বদিগন্তে আলোক-উদ্ভাস এখনো অনেক দূর।


শুক্রবার, ১ আগস্ট, ২০১৪

গল্প / সাপলুডু



শিউলি চিরকুটে চোখ বুলিয়েই বলে উঠলেন-


-উনি কোথায়? হ্যাঁ, চলে আসতে বলুন।


-স্যার বাসার গেটে; গাড়িতে । আপনি একটু আসবেন?


দুতলার সিঁড়ি ভেঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন তিনি। আজ মৃত্তিকা আর আকাশের প্রথম সাক্ষাৎ।


তাঁর পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে- কাঁপুনির মাত্রা এত তীব্র হতে পারে তিনি তা ঘূণাক্ষরেও ভাবেননি। ভাবতে পারার কথাও নয়। দীর্ঘ আঠারো বছর পর এ রকম কেউ ভাবতে পারে না। শিউলি কাঁপছেন আর ভাবছেন- কীভাবে তাঁকে রিসিভ করবেন ।


২.


শত সহস্র সবুজ সকাল আর রোদেলা দুপুর শেষে সায়াহ্ণের শেষ রাগিনী এখন বেজে উঠেছে; কিন্তু এই নামটি তাঁর কাছে আজও এক অমেয় শক্তির উৎস। তাই বুঝি আধাঁর রাতের চোরাগলি তাঁকে ছুঁতে পারেনি এতটুকু। এটি আঠারো বছর ধরে জ্বলতে থাকা এক জীবনবাতি । সতের বছরের যন্ত্রণা আর অবরোধবোধকে ছুঁড়ে মারতে পেরেছিলেন তিনি এই একটি নামের প্রচন্ড শক্তিতে। সেদিন উষ্ণ উত্তেজনা আর অপার আনন্দের হাতছানিতে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন পঁচিশের ঘরে। আহা, কী মুক্তি! আনিস আহমেদ অযাচিতভাবেই নামটি পেয়েছিলেন ভালবাসার মহার্ঘ্যরূপে। কেউ যদি এভাবে অতল শূন্যতার নীলযন্ত্রণায় নিজেকে উন্মোচন করেন যে কোন মানুষ সহজে গলে যাবেন; দ্বিতীয় চিন্তা তার মাথায় আসবে না। কয়েক দিনের আলাপচারিতা- সেই মায়াবি কণ্ঠের তীব্র আকর্ষণ, অভাবনয়ীয় মুক্তির স্বপ্নে তিনি আজীবন ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।


আনিস আহমেদ ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখি করতেন। তাঁর কবিতার অনুরাগী নিরালা তাঁরই প্রেমে পড়ে মনের অজান্তে। নিরালা নিরালাই- কোন রকম সাতপাঁচ সে বোঝে না। প্রেমে পড়েছে-কূলে ডুবেছে। বিয়ে করেই সে মুক্তি খোঁজে। অবশেষে একদিন বিয়ের সাঁনাই বেজে ওঠে। বিয়ের পর পরই আনিসের বাবা মারা যায়। নাগরিক জীবনের জটিলতা আর পেশাগত ব্যস্ততায় এবার যেন খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। লেখলেখি বন্ধ হয়ে যায় -সকাল বিকেল অফিস।  শহর থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব একশো কিলোমিটার। কিন্তু পড়ার নেশাটা তাকে চেপে বসে দ্বিগুণ। রোহিতের আট বছর পর রিমি ঘরে আসে। রিমির আধো আধো কথা, মিটমিটে তারার মতো দুই চোখ তাঁকে আবার আনমনা করে তোলে- লেখালেখির দিকে টেনে নেয়।


ফেসবুক দূরের মানুষকে কাছে আনে; কাছের মানুষকে দূরে টেলে দেয়- দিন দিন বাড়তে থাকে বন্ধুদের তালিকা। এভাবে একদিন শিউলির সাথে তাঁর পরিচয়।


আনিসের গল্পকবিতার জন্যে যেন অধীর অপেক্ষায় থাকেন শিউলি। প্রতিটি লেখার নির্মোহ বিশ্লেষণে পারদর্শী মেয়েটি। তাঁর লেখা কয়েকটি ছোট কবিতা আনিসের দৃষ্টি কাড়ে- কৌতূহল বাড়তে থাকে। ছোট ছোট পংক্তির আটপৌরে শব্দরাজি তীরের ফলার মতো শাণিত - এক গভীর বোধ ও বেদনায় আচ্ছন্ন করে তোলে তাঁকে। একদিন নিছক খেয়ালের বসে আলাপ শুরু।


আপনার কি লেখালেখির প্রতি দুর্বলতা আছে?


-একটু একটু আছে।


শিউলি আনিসকে লেখালেখি বন্ধ না করতে অনুরোধ করেন। এক মাসের মাথায় তাঁরা ভালো বন্ধুরূপে পরস্পরের মনে জায়গা করে নেয়। এক ফাঁকে শিউলি তাঁর সাথে ফোনে কথা বলার আগ্রহ দেখায়। একদিন শেষ বিকেলে বেজে উঠে আনিসের মুঠোফোন।


হ্যালো, শিউলি বলছি- কেমন আছেন?


ওহ আপনি? ভালো। কী খবর বলুন। আপনি কেমন আছেন?


ভালো আছি। আপনি কোথায়?


বাসায়।


কে কে আছেন ? কথা বলা যাবে?


সবাই আছে। এক মিনিট পর আমি রিং করছি।


তারপর আনিস বাইরে আসেন। একচল্লিশ মিনিট কথা বলার পর আনিসের মধ্যে এক ধরনের বিমূঢ় বেদনা কাজ করে, করতে থাকে। জীবন এমনও হয়!


৩.


হ্যালো, হ্যালো, কেমন আছেন?


এই তো, আছি এক রকম।         


কেন? এক রকম কেন?


দেখুন কেউ কি সব সময় ভাল থাকে। সব সময় এক নয় মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত আলাদা আলাদা সুর আর স্বরে জীবনকে স্পর্শ করে। এই যে একটু কথা বলবো গতকাল থেকে এই অপেক্ষা ।


বাসায় আর কে কে আছে?  আপনি তো বেশ একা।


না, তেমন একা নয়। মিলি আর মাধুর্য আমার সঙ্গে থাকে-আমার ভাইয়ের দুই মেয়ে । ওরা আমাকে মা ডাকে। এই ডাক শুনলে মাঝে মাঝে আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। অভিশপ্ত জীবন আমার ... ...।


হায়, এভাবে জীবন চলে! আমি  বুঝতে পারছি না- আপনি কেন এই দীর্ঘ সময়টুকু নিজেকে বঞ্চিত করলেন। কথাগুলো খুলে বললে হয়তো অনেক আগেই একটি সমাধান হয়ে যেত। (শিউলির কণ্ঠ আস্তে আস্তে ভারি হয়ে উঠে- দীর্ঘশ্বাসের তীব্রতা মোবাইলের গায়ে লেগে আনিসের কানে আছড়ে পড়ে।) স্যরি,আপনি কি কাঁদছেন? আনিস খুব সহজে বুঝতে পারছেন- ওপারে তিরিশ উত্তর এক নারী কাঁদছেন।


ওহ, ভাইজানের নামটা বলবেন? আপনাদের নিজেদের কোন সমস্যা নেই তো?


ওর নাম বাশার, আমি তাকে বকুল বলে ডাকি। তাই আমাদের বাড়ির নাম দিয়েছি- বকুলবিলাস।


ভাইজানকে ডাকেন বকুল। বেশ ভালোই তো। আর আমাকে?


আকাশ- আপনি আমার আকাশ; যাঁর বুকে আমার স্বপ্নরা লালনীলশাদা মেঘ হয়ে উড়ে বেড়ায়- মুক্তি খোঁজে।


খুব ভারি কথা। উনি কী করেন ?


পারিবারিকভাবে ওদের রেস্টুরন্ট বিজনেস। দেশে ফেরার পর উর্বশী আর অপ্সরী নামে আরো দুটো মটেল করেছে। এটি পর্যটন শহর-সারা বছরই গেস্ট থাকে।


ওহ, মূল কথায় আসি। আপনার বইগুলোর বিষয়ে বলুন- কারা, কখন প্রকাশ করলো ? জানেন তো দীর্ঘদিন লিখিনি।


হ্যাঁ, আমার তিনটি উপন্যাস আর দুটো কাব্যগ্রন্থ আছে। লেখালেখি মানে ব্যস্ত থাকা। তবে আমার পড়তে ভালো লাগে- পড়ার নেশা আমার আছে। এগুলো ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে- শুদ্ধস্বর, ঐতিহ্য, পারিজাত ও পাঠসূত্র বইগুলো করেছে।


৪.


হ্যালো, আকাশ বলছি-কেমন আছেন?


হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি?


আমি ভালো। আজ আকাশ বেশ মেঘলা, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। একটি সুখবর আছে- আপনার নতুন নাম মৃত্তিকা। এটি আমার দেয়া। না করবেন না প্লিজ। গতকাল আমি চিকিৎসার কথা বলেছিলাম। আপনারা দুজনের... .. ..


হ্যাঁ, মৃত্তিকা- গভীর,গম্ভীর- ব্যঞ্জনাটা বেশ আলাদা। সারাজীবন মাটির মতো সব সয়ে গেলাম। জুতসই নামের জন্যে ধন্যবাদ। না, আমার কোন সমস্যা নেই। জানেন- নিঃসন্তান নামের অপবাদটা আমাকেই শুনতে হয়েছে দীর্ঘদিন। বিয়ের তিন বছর পর সবাই বলাবলি শুরু করলে সে সেকেন্ড ম্যারেজ করে- তাঁর দূর সম্পর্কের এক মামাতো বোনকে। বিয়ের তের দিনের মাথায় সে সংসার ভেঙ্গে যায়। তখনই নানা কথা হাওয়ায় উড়তে শুরু করে।


কী কথা- বলা যাবে? সে সংসার তো এখন নেই।


রাইসা বিয়ের দুদিন পরই মুখ খোলে। তার দাদিকে বলে- বাশার অসুস্থ্, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নেই। তখন সবাই আমার দিকে মুখ দেখাদেখি শুরু করে, আমি নীরবতায় চুপসে যাই। এই নীরবতাই এখন আমার জীবনের কাল হয়েছে।


আচ্ছা, রাইসা যা দুদিনের মাথায় পারলো তা আপনি এতদিনেও পারলেন না কেন? আপনার এমন কেউ কি ছিল না-যাঁরা আপনাকে... ...?


সবাই সব কিছু সমান পারে না। ভেবেছিলাম একদিন ঠিক হয়ে যাবে। শরীর বিষয়ে আমি বেশ মুর্খ- তা ছাড়া পুরুষের সুস্থতা মাপার নিক্তি তো আমার হাতে নেই। তার আচরণে কোন অমিল তেমন দেখিনি। শরীরী প্রসঙ্গে ও প্রায় নীরব থাকে। মাঝে মাঝে তাঁর এক ডাক্তার বন্ধুর সাথে আলাপ করে। সে তখন ঠাট্টা করে বলতো- তোমাকে আবার বিয়ে দিতে হবে। তখন তাঁর অক্ষমতার বিষয়টি আমি বুঝি। আমার মন ও শরীর তীব্র বঞ্চনায় আজ নীল হয়ে আছে। এভাবে আমি দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ি। মাঝে মাঝে মাথার দুঃসহ ব্যথায় ছটফট করি- বমি আসে। প্রেসারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।


আপনি কি বিকল্প কিছু ভাবছেন?


না, তা বলিনি। কোন মানুষ কিছু কথা মনের ভেতর দাগ কেটে যায়, জখমটা কখনো সারে না।


যখন সব সয়ে গেলেন-এখন আবার এইসব কেন? এ জন্যে দায়ী কে?


যদি বলি আপনি।


(আকাশ এই বাক্যবাণে পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।) আমরা যেহেতু ভাল বন্ধু- দায়তো নিতেই হয়। দুঃখিত। আপনাকে আদৌ কষ্ট দিতে চাইনি।


আপনাদের বিয়ে হলো কয় বছর আগে?


এগারো বছর আগে। পারিবারিক বিয়ে। ও বয়সে আমার বছর দশেক বড়।  বিয়ের দুই বছর পর আমার মা মারা গেলে আমাকে বেশির ভাগ সময় অসুস্থ বাবাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। ভাইয়ের পড়ালেখা, দুইবোনের বিয়ের কথা ভেবেছি দিনের পর দিন। তাদের বিয়ে দিলাম। এভাবে সময় গড়িয়ে গেল। যখন নিজের দিকে তাকাই বুকটা হুহু করে উঠে।


আমরা যে কথা বলছি- কিছু মনে করছেন না তো? আপনার পরিবারের আবহাওয়াটা কেমন?


আমি তার সাথে খোলামেলা আলাপ করি। আমরা উদার হলেও উগ্রতাকে পছন্দ করি না। এ রকম পরিবেশে বাবা আমাদের বড়ো করেছেন।


ঠিক আছে। শরীরের দিকে খেয়াল রাখবেন। ভাল থাকুন । আজ রাখি।


আপনিও ভাল থাকবেন।


৫.


হ্যালো, মৃত্তিকা কেমন আছেন? আজও ডিস্টার্ব করছি।


ভালো আছি। ডিস্টার্ব হবে কেন? আমি তো আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকি।


ধন্যবাদ, শুনে খুবই ভালো লাগল।


আপনি কেমন আছেন? আমি মুক্ত।


আপনি মুক্ত- কীভাবে! মানুষ কখনো মুক্ত হতে পারে ? আমৃত্যু হাজারো শেকল তাকে আঁটসাঁটে বেঁধে রাখে। যাকে আমরা ডিসিপ্লিন বলি।


ঠিক আছে। মাঝে মাঝে আসতে পারবেন তো ?


অহ, তাই ; যাওয়া যায়। কিন্তু এই যাওয়া-আসা একদিন সংজ্ঞা খুঁজবে, পরিচিতি চাইবে। আমাদের পরিবার বয়স পেশা তা কতটুকু অ্যালাও করবে- তা কিন্তু ভাববার বিষয়।


বাশার ভাইয়ের সাথে আপনার কী কোন গ্যাপ আছে?


না, আমরা খোলামেলা কথা বলি। সে কখনো আমাকে সন্দেহ করে না।


ফাইন, গুড রিলেশান। উনি আপনাকে সময় কেমন দেন? আপনার স্যাটিসফেকশান কেমন ?


রাতে বারোটার দিকে একবার দেখা হয়- তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। সে টা তো শূন্যের কোটায়।


হায়, আপনি তো অসুস্হ্য হয়ে যাবেন। এভাবে... ... ..


আমি প্রায়ই অসুস্থ থাকি। মাথা ব্যথা আর রক্তচাপ তো জীবনসঙ্গী হয়ে আছে।


আপনার ওয়েট কেমন? হাইটের সাথে মিল আছে আছে তো ?


এই তো ষাট-একষট্টি থাকে। আমি  লম্বা না-পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি।


আপনার কালার বেশ চমৎকার।


এখন তেমন নেই- হ্যাঁ এক সময় তা ছিল।


বয়স তো তেমন বেশি নয় আবার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখা শুরু করতে পারেন।


চত্রিশ বছর কম সময় নয়। আবার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখায় ফিরে যেতে চাই না। বরং আপনার কথা বলুন- শুনি, এখন কী করছেন?


আমার কী জানতে চান? সবই বলেছি। আমি ভূত নয়- ছেলে মানুষ; বউবাচ্ছা নিয়ে আছি যুগের সাথে তাল মেলাতে পারি নাহৃদয় কাজ বেশি করে- মস্তিষ্ক কাজ করে না লাভ লোকসান বুঝি না- বুঝতে চাই নামানুষকে ভালবাসি-ভালোবাসা পেতে চাই জীবনকে ভালো লাগে হ্যাঁ, আমাদের দেখা হবে। আপনি যখনই চান।





একদিন হঠাৎ ফোন ধরা বন্ধ করে দেন মৃত্তিকা। অকারণে-একতরফাভাবে। আকাশ বার বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এমনকি তাঁকে আর ফেসবুকে পাওয়া যায় না। না, ছোড়বান্দা আকাশ এবার সবকিছু সংরক্ষণ করতে শুরু করেন। ছবির অ্যালবাম, চ্যাটিং সংলাপ, মুঠোফোনের দীর্ঘ আলাপ সবই তিনি সযতনে রাখেন। প্রস্তুতি নিতে থাকেন যে কোন মূল্যে মুখোমুখি  হবার। তখন তাঁর একটি স্ট্যাটাস ফেসবুকে তুমুল ঝড় তোলে-


কোথায় লুকোবে তুমি- সঙ্গমে শৃঙ্গারে, শূন্যতায় সংসারে- হৃদয়ে রেখেছি পুঁতে ঈশ্বরের চোখ- সাথে নিজের তরুণতম ছবিটির ডানভাগ দ্বিখণ্ডিত নামে কাভার ব্যানার হিসেবে আপলোড করেন। বিষয়টি আর কারো অজানা থাকে না।


৬.


কেউ এই বয়সে একা হাসপাতালে আসে না। আসার কথা নয়। যার পরিবার পরিজন আছে- তিনি কেন এ রকম করবেন। সকাল সাড়ে এগারোটায় আজাদ নামের এক তরুণ কর্মচারী তাঁকে হাসপাতালে রেখে যায়। ডাক্তাররা তাঁর একজন আ্যাটেনডেন্টের কথা বলছেন। শ্বাসকষ্টটা বাড়ে- হঠাৎ বমি আসে। কখনো বুকের ব্যথায় দাঁতের পাটি দুটো খিঁচে থাকেন। গায়ে জ্বর- পাঁচ দিন ধরে অসুস্হ তিনি। আনিস আহমেদ এখন একটি কাগুজে নাম মাত্র। সোসাইটির কেউ এ নামে তাঁকে চেনে না। মেডিক্যাল কলেজের ৩০৩ নং ক্যাবিন। ফ্যামিলির কেউ নেই। কর্মস্থল থেকে সরাসরি হাসপাতালে। শুয়ে শুয়ে পুরোদিন খবরের কাগজ আর কবিতার বই পড়েন। এক নিরীশ্বর পৃথিবীর কথা ভাবেন- যেখানে প্রেম নেই, স্বপ্ন নেই; কিছু বিপন্ন বোধ নিঃসঙ্গ মানুষকে তাড়া করে।


দরজাটা প্রায় খোলাই থাকে। এই অতিরিক্ত কাব্যকাতরতা পাশের ক্যাবিনগুলোর রোগীর আত্মীয়স্বজনকে একটু হতচকিয়ে তুলে। তাদের কেউ কেউ আঁচ করেছেন গভীর অভিমানে তিনি পলাতক। শাহেদ তাঁর সঙ্গে খাতির জমায় সময় কাটাবার অছিলায়। তারও সময় কাটে না। খবরের কাগজের খেলাধুলার পাতাগুলোই মনের খোরাক । সে  বড় মামাকে নিয়ে পাশের ক্যাবিনে আছে- আজ নয় দিন ।


রাত দুটোয় বুকের ব্যথাটা হঠাৎ বেড়ে যায়- মুখ ভরে বমি আসে। দরজাটা খোলা দেখে উঁকি দিতে গেলেই শাহেদ বুঝতে পারে মুরুব্বির সময় শেষ। তখন তাঁর পুরো শরীর ঘামে ভেজা। সে তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নার্স ডাকতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে একজন আয়া দৌড়ে আসে।





৭.


আনিস স্বপ্নকে ছুঁয়ে যাবে, নিরালার নৈকট্য তাঁকে করে তুলবে প্রবল আত্মবিশ্বাসী-এই প্রত্যয়ে জীবনটি শুরু হয়েছিল। তা দিনে দিনে ফিকে হয়ে গেছে। যেখানে কোন চকচকে গাড়ির স্বপ্ন নেই, সুরম্য প্রাসাদের আকাঙক্ষা নেই, বিদেশের সেরা লোকেসনগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা আকাশকুসুম কল্পনা- সেখানে একজন আধুনিক শিক্ষিত নারীর দম তো বন্ধ হয়ে আসতে পারে। হাঁপিয়ে ওঠেন নিরালা। জীবনের শুরুতে আনিসকে দেয়া কথাগুলো এখন অনেকটা তাঁর মনে নেই। দর কষাকষিটা শুরু হয়েছিল রোহিত কোন মিডিয়ামে পড়বে- বাংলা না ইংলিশ তা নিয়ে। পরে এটি ডালপালা মেলেছে। শহরে এক টুকরো জমি, ফ্ল্যাটবাড়ি এই সব ইস্যু নিরালা-আনিসের বন্ধনটুকু শিথিল করে দেয় ।





মানুষ তার গন্তব্য জানে না। সাপলুড়ু খেলার মতো সে হাঁটতে গিয়ে দৌড়ায় আবার দৌড়াতে গিয়ে  কুপোকাত। কে হাঁটেন, কে হাঁটান; কে দৌড়েন, কে দৌড়ান তা সে ভাবে না। এই অবকাশটুকু তার নেই। অথবা সে ভাবতে জানে না। আবার কেউ কেউ ভাবেন; ভেবে কী হবে-কোন কূল কিনারা নেই। কিন্তু সে মন্তব্য করতে ভালেবাসে, গন্তব্য চেনে না। সময় আর জীবনের সম্পর্ক ভুলে যায় অনায়াশে। ভোগে বিশ্বাসী মানুষ উপভোগের কদর বোঝে না। অনুভূতির জগতে একদিন সে ফতুর হয়ে পড়ে।


ছক কাটা ঘর থেকে বের হতে চেয়েছে আকাশ- রোদের আলোয় পুড়তে ভালোবেসেছে, জোছনার আভায় ভিজতে ভালোবেসেছে। এই সরল সময়যাপনই তাঁকে পরিবার-পরিজনের কাছে উনমানুষে পরিণত করে। নিরালা-তার স্ত্রী; দুজন দুজনের বন্ধু। বত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পূর্বেও তাঁদের বন্ধুতা ছিল কয়েক বছর। জানাশোনা, ঘোরাঘুরি, আড্ডবাজি সবই তো ছিল। ক্যাম্পাসের পরিচিত যুগলদের মধ্যে তাঁরাই ছিল শীর্ষজুটি। কিন্তু দাম্পত্যের বিপ্রতীপ বিন্যাসে দায়বোধ যতটা বেড়েছে অনুভবের তীব্রতা কমেছে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। কেন এমন হলো! কেন এমন হবে!


সেই ছোট রিমি এখন কানাডায়- যার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ছড়া শোনাতেন তরুণ অনিস। প্রকৌশলী তুহিনের সংসার আলো করে তাদের ঘরে এসেছে সারাহ আর সুজাত। এই কথাগুলো মনে পড়লে ক্যাবিনের এই একা একঘেঁয়ে জীবনেও যেন এক মায়াবী সুরের দোলা নেচে যায়। সুজাত  একদম রোহিতের মতো- মামার ফটোকপি যেন।


৮.


অ্যাম্বুলেন্সটি সকাল নটা নাগাদ বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো। সঙ্গে দুজন তরুণ- রাশেদ ও আজাদ। যাঁরা গত চার দিন ধরে তাঁর সেবা করেছেন। ঔষধপত্র খাবার দাবার এনে দিয়েছেন- পরম ভালোবাসায়। রাশেদের পকেটেই চিঠিটি ছিল।  চিঠি নিয়ে সে সরাসরি গেট পেরিয়ে বাসায় ভেতরে ঢোকে। কলিং বেল বাজাতেই এক ভদ্র মহিলা দরজা খুলে চিঠিটি নিলেন। শিউলিকে লেখা এক টুকরো পুরোন কাগজ।


নীল, আমি এসেছি; আর কোথাও যাবো না কিন্তু। হ্যাঁ, এটি আমাদের প্রথম দেখা। তুমি যে বলেছিলে- মাঝে মাঝে আসতে পারবেন তো -দুঃখিত, তখন আসতে পারিনি। কেন পারিনি তা তো তুমি জান। আজ হঠাৎ ভাবলাম তোমাকে না দেখে আমার ফেরা হবে না। আমি আমার কথা রেখেছি। তুমি কী এখন আমাকে চিনবে? আমি তোমার আকাশ- যার বুকে মাথা রেখে নীলমেঘ ঘুমিয়েছে অনেক রাত।


তুমি এবার আমাকে নিরালার কাছে নিয়ে যাবে- সে যাতে আর আমাদের আর ভুল না বোঝে।