বুধবার, ১০ জুলাই, ২০১৩

গল্প- ছাতার সংসার

                                                                                             

 
 
 
 
 
 
 
প্রিয়বর্ষা                                                                                                                                                                                            
কেমন আছো ? তুমি কি আমাকে চিনতে পারছো ?  আজ তো নতুন নামে ডাকলামআমি আদিত্য, তোমার সেই বর্ষার বন্ধুআমাদের দেখা সাক্ষাৎ নেই আজ একুশ বছরআমি নিশ্চিত -আমার এ লেখা তুমি পড়বে না, তোমার পড়ার বা দেখার সুযোগ হবে না                                                                                                                
আজ অন্য এক যুগলকে দেখে হঠাৎ তোমাকে মনে পড়লোনিজেকে আর ধরে রাখতে পালাম নাতুমি বলতে পারো -এটা আমার অচরিতার্থ প্রণয় কামনাসরলভাবে বললে ঈর্ষা, তোমাকে না পাবার তীব্র আকুলতাহয়তো বা ঠিক তাইঅপ্রাপ্তির বেদনাটুকু আমার হৃদয়ে বেঁচে থাকল দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে, দগদগে ক্ষতটুকু রইবে আজীবনএই ক্ষত শুকোবে না, এই বেদনার কোন প্রশমন নেই। সব মিলিয়ে আমরাতো এক রকম আছিপরস্পরের প্রতি কোন অভিযোগ নেই -অনুযোগ নেইতোমাকে বলা হয়নি-কিন্তু, ঠিকই বর্ষার কদম ভেজা বৃষ্টি, শাপলা ফোটা স্বচ্ছ পুকুর আমাকে এখনও আমাকে আনমনা করে তোলেএ কেমন সম্পর্ক আমরা কেউ কারো ঠিকানাটুকুও জানি নাজানার আগ্রহটুকুও নেইএ কেমন ভালোবাসা ! শুধু পথ চেয়ে থাকা -অনন্ত প্রতীক্ষা
তাঁরাও ঠিক আমাদের মত ছাতার সংসার শুরু করেছে। দুজনেই আনম্যারেড তরুণ-তরুণী। সময় এগিয়েছে অনেক দূর। আমরা ছিলাম একই ধর্মের একই বর্ণের,একই বিভাগের,একই বিশ্ববিদ্যালয়ের।   কিন্তু তাঁদের ধর্ম আলাদা, বর্ণ আলাদা, শিক্ষাও বেশ আলাদাআমরা ছিলাম শিক্ষার্থী, আর তাঁরা... ... হ্যাঁ, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কত দিন এক সাথে এক ছাতার নিচে কাটিয়েছিতা কি তোমার এখন মনে পড়ে ? আমি জানি-তোমার এসব আর মনে পড়ে নাএখন বুঝি - আমাদের ওই সীমাবদ্ধ সম্পর্কটি ছিল এক ছাতার সংসার মাস্টার্সের ক্লাসগুলো শুরুর পর পর সংসারটি শুরু হয় যখন তাড়া থাকে আমরা ছাতা গুটিয়ে নিই; শুরু করি রিকশার সংসার গ্রীষ্মবর্ষা শরতহেমন্ত শীতবসন্ত ঘুরে ফিরে পুরো এক বছর আমরা এভাবে কাটাই                                                                                                                                                                                                 আষাঢ়ের প্রথম বুধবার -তুমি শাটল ট্রেন থেকে টপ টপ পায়ে নামলে। আমার সামনে এসে দাঁড়ালে, তোমার হাতে বর্ষার রোমান্সের চিরায়ত স্মারক এক জোড়া কদম ফুলসামনে এসেই বললে, কেমন আছো আদিত্যএই নাও -তোমার ফুলএকই বৃন্তে ফোটা ভেজা দুটো ফুল - ভালোবাসায় আর্দ্র অনুভবের প্রতীকএকটি আরেকটির গায়ে লেগে আছে - নিবিড় মমতায়কয়েকটি সবুজ পাতায় জড়ানোআমি তোমার হাত হতে ফুলের তোড়াটা নিইআমার গায়ে হালকা কাঁপুনি দোলা দিয়ে যায়                                                                                                                                   
 তারপর আমাদের ছাতার সংসারে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম, ভিজতে শুরু করলাম, কখনো কখনো পুড়তে শুরু করলাম                                                           
সাউথ ক্যাম্পাসের আবাসিক এলাকায় হাঁটছিলাম আমরা চারদিকে বৃষ্টিস্নাত সবুজের মেলাগোধূলির আলোছায়া নেমে এসেছে মধ্যাহ্ণেপথের পাশে বড় পুকুর - সাদা শাপলাগুলোর মাঝে একটি লাল শাপলা গলা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে তুমি আচানক থমকে দাঁড়িয়ে বলে ফেললে-‘আদিত্য, ওই লাল শাপলাটা এনে দাওনয়তো পুকুরে ঝাঁপ দেবোআমি কিন্তু সাঁতার জানি না                                                                                                                                                               
আমি থ বনে গেলামতুমি নাছোড়বান্দাআমি এদিকে ওদিকে তাকাতে থাকলামআশে পাশে তেমন লোকজন নেইবর্ষার ভরা দুপুরটুপটুপ বৃষ্টি কোন উপায় নেইকিছু দূরে এক রাখালকে দেখে কিছুটা আশ্বস্থ হয়ে দাঁড়ালাম  অনুরোধ করার পর লাল শাপলাটি তোলার জন্যে পুকুরে নামতে রাজি হলো সেতুমি গেলে বিগড়ে তোমার শর্ত আমাকেই শাপলা তুলে আনতে হবেনিরুপায় আমি পুকুরে নামলাম, আমার বুক পর্যন্ত ভিজে গেলশাপলাটি তুলে তোমার হাতে দিলামএটি হাতে নিয়ে তুমি থরথর করে কাঁপতে শুরু করলেতোমার চোখ দুটো ভিজে গেলতোমার কাঁপুনি আর থামে নাঅকষ্মাৎ তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলেআমার ভেজা শার্ট-প্যান্ট তোমার গায়ে জড়িয়ে অনেকটা ভিজিয়ে দিলোআমরা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলাম
একটু হাঁটার পরে আবার রিকশা পেলামতুমি রিকশার ভেতরে আমার হাত ধরে আবার বললে- আদিত্য, কথা দাও, তুমি আমাকে সাঁতার শেখাবেআমি শোনেও না শোনার ভান করে বসে থাকলাম                                                                                               তারপর তোমাকে হলে পৌঁছে দিয়ে আমি আমার হলে ফিরিভেজা শরীরে কাঁথা জড়িয়ে ঘুমাইস্বপ্ন দেখি-আমি আবার সেই শাপলাভরা পুকুরে বুক ভরা জলে দাঁড়িয়ে আছিআমার দুহাতের উপর তুমি সাদা হাঁসের মতো ভেসে ভেসে লাফিয়ে লাফিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছো তারপর .... ....                                  
আমার ছোটবোনের এসএসসি পরীক্ষাতোমার ছোট মামার বিয়েআমরা দুজনে দুদিকে ছুটে গেলাম  তুমি মামার বিয়েতে গেলেযাবার আগে তোমার বাড়ির ঠিকানাটুকু লিখে দিলে আমার নোটবুকে;  বলে গেলে পথ ঘাটের অবস্থাটা কেমনআমাকে বারবার করে বললে-আদিত্য, তুমি রফিক মামার বিয়েতে আসবেঅবশ্যি আসবেএসো আমাদের দ্বীপটুকু দেখে যাও-তোমার পছন্দ হবেআমি কথা দিলাম-যাবোতবে মামার বিয়ের দুয়েকদিন পর                                                                                                                                                             
আমি পরিবারের বড় ছেলেরাজুর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করাটা ছিল বেশ জরুরিবাবাকে দুদিনের দায়িত্ব দিয়ে এক ফাঁকে গিয়ে ঘুরে আসবো -এই ছিল    কথা                                                                                                                                                                                               
১৯৯১ সাল২৬ শে এপ্রিল  মামার বিয়েআর ৩০ এপ্রিল এএসসি পরীক্ষা শুরু                                                
পরীক্ষা পেছালো।                                                                                                                                      
তুমি কি জানো ? হ্যাঁ, আমি তোমার কাছে গিয়েছিলাম -বিয়ের তিন দিন পর; ৩০এপ্রিল।
সেদিন অঙ্গীকার আর অনুরাগের চেয়ে আতঙ্কই ছিল অনেক বেশিকারণ তুমি সাঁতার জানো নাতোমাকে এখনো সাঁতার শেখাতে পারিনি                                                     
ঝকঝকে রোদসকাল ১১ টায় আমি তোমাদের দ্বীপে গিয়ে নামলামওখানে আগে কখনো যাইনিতোমাদের গ্রাম মাইটভাঙ্গা আরো একটু দূরেহাঁটছি আর আমার বুক কাঁপছেপথের দুধারে সারি সারি লাশ পড়ে আছে-শত শত নারী শিশু বৃদ্ধ তরুণ একরাতেই শেষবাড়িঘর মন্দির মসজিদ মাদ্রাসা স্কুল সব নিশ্চিহ্নগ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে গেছে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে তোমার গ্রামে পৌঁছার আগেই বুঝেছি - না, আমাদের আর দেখা হবে নাতোমাকে আর পাবো না২৯ শে এপ্রিলের কালরাত তোমাকে বাঁচতে দেবে না হ্যাঁ, আমাদের আর দেখা হলো নাআর দেখা হবে না                                                                                                                                                
আমি এখনও ছাতার সংসারে তোমাকে খুঁজি; রিকশার সংসারে তোমাকে দেখি- পাই না। তোমাকে সাঁতার শেখানোর স্বপ্নটি এখনও বার বার আমার ঘুম ভাঙ্গায়আমি থরথর করে কেঁপে ওঠি।
 আদিত্য-                                                                                                                 তোমার বর্ষার বন্ধু
 
 
 

                                                                                                                                                                                                     

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন