প্রিয়বর্ষা
কেমন আছো ? তুমি কি আমাকে চিনতে পারছো ? আজ তো নতুন নামে ডাকলাম। আমি আদিত্য,
তোমার সেই বর্ষার বন্ধু। আমাদের দেখা সাক্ষাৎ নেই আজ একুশ বছর। আমি নিশ্চিত -আমার এ লেখা তুমি পড়বে না, তোমার পড়ার বা দেখার সুযোগ হবে না।
আজ অন্য এক যুগলকে দেখে হঠাৎ তোমাকে মনে পড়লো। নিজেকে আর ধরে রাখতে পালাম না। তুমি বলতে পারো -এটা আমার অচরিতার্থ প্রণয় কামনা। সরলভাবে বললে ঈর্ষা, তোমাকে না পাবার তীব্র আকুলতা। হয়তো বা ঠিক তাই। অপ্রাপ্তির বেদনাটুকু আমার হৃদয়ে বেঁচে থাকল দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে,
দগদগে ক্ষতটুকু রইবে আজীবন। এই ক্ষত শুকোবে না, এই বেদনার কোন প্রশমন নেই। সব মিলিয়ে আমরাতো এক রকম আছি। পরস্পরের প্রতি কোন অভিযোগ
নেই -অনুযোগ নেই।
তোমাকে বলা হয়নি-কিন্তু, ঠিকই বর্ষার কদম ভেজা
বৃষ্টি, শাপলা ফোটা স্বচ্ছ পুকুর
আমাকে এখনও আমাকে আনমনা করে তোলে। এ কেমন সম্পর্ক আমরা
কেউ কারো ঠিকানাটুকুও জানি না। জানার আগ্রহটুকুও নেই। এ কেমন ভালোবাসা ! শুধু পথ চেয়ে থাকা -অনন্ত প্রতীক্ষা।
তাঁরাও ঠিক আমাদের মত ছাতার সংসার শুরু করেছে। দুজনেই আনম্যারেড তরুণ-তরুণী। সময় এগিয়েছে অনেক দূর। আমরা ছিলাম একই ধর্মের একই বর্ণের,একই বিভাগের,একই বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু তাঁদের ধর্ম আলাদা, বর্ণ আলাদা, শিক্ষাও বেশ আলাদা। আমরা ছিলাম শিক্ষার্থী,
আর তাঁরা... ...। হ্যাঁ,
আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কত দিন এক
সাথে এক ছাতার নিচে কাটিয়েছি। তা কি তোমার এখন মনে
পড়ে ? আমি জানি-তোমার এসব আর
মনে পড়ে না।
এখন বুঝি - আমাদের ওই সীমাবদ্ধ সম্পর্কটি ছিল
এক ছাতার সংসার। মাস্টার্সের ক্লাসগুলো
শুরুর পর পর সংসারটি শুরু হয় । যখন তাড়া থাকে আমরা ছাতা
গুটিয়ে নিই; শুরু করি রিকশার সংসার
।
গ্রীষ্মবর্ষা শরতহেমন্ত শীতবসন্ত ঘুরে ফিরে
পুরো এক বছর আমরা এভাবে কাটাই। আষাঢ়ের প্রথম বুধবার -তুমি শাটল ট্রেন থেকে টপ টপ পায়ে নামলে।
আমার সামনে এসে দাঁড়ালে, তোমার হাতে বর্ষার রোমান্সের চিরায়ত স্মারক এক জোড়া কদম ফুল। সামনে এসেই বললে, কেমন আছো আদিত্য। এই নাও -তোমার ফুল।’একই বৃন্তে ফোটা ভেজা দুটো ফুল - ভালোবাসায় আর্দ্র অনুভবের প্রতীক। একটি আরেকটির গায়ে লেগে আছে - নিবিড় মমতায়। কয়েকটি সবুজ পাতায় জড়ানো। আমি তোমার হাত হতে ফুলের তোড়াটা নিই। আমার গায়ে হালকা কাঁপুনি দোলা দিয়ে যায়।
তারপর আমাদের ছাতার সংসারে
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম, ভিজতে শুরু করলাম, কখনো কখনো পুড়তে শুরু করলাম।
সাউথ ক্যাম্পাসের আবাসিক
এলাকায় হাঁটছিলাম আমরা । চারদিকে বৃষ্টিস্নাত
সবুজের মেলা।
গোধূলির আলোছায়া নেমে এসেছে মধ্যাহ্ণে। পথের পাশে বড় পুকুর - সাদা শাপলাগুলোর মাঝে একটি লাল শাপলা
গলা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে তুমি আচানক
থমকে দাঁড়িয়ে বলে ফেললে-‘আদিত্য, ওই লাল শাপলাটা এনে দাও। নয়তো পুকুরে ঝাঁপ দেবো। আমি কিন্তু সাঁতার জানি না।’
আমি থ বনে গেলাম। তুমি নাছোড়বান্দা। আমি এদিকে ওদিকে তাকাতে থাকলাম। আশে পাশে তেমন লোকজন নেই। বর্ষার ভরা দুপুর। টুপটুপ বৃষ্টি । কোন উপায় নেই। কিছু দূরে এক রাখালকে দেখে কিছুটা আশ্বস্থ হয়ে দাঁড়ালাম। অনুরোধ করার পর লাল শাপলাটি তোলার জন্যে পুকুরে নামতে রাজি হলো সে। তুমি গেলে বিগড়ে । তোমার শর্ত আমাকেই শাপলা
তুলে আনতে হবে।
নিরুপায় আমি পুকুরে নামলাম,
আমার বুক পর্যন্ত ভিজে গেল। শাপলাটি তুলে তোমার হাতে দিলাম। এটি হাতে নিয়ে তুমি থরথর করে কাঁপতে শুরু করলে। তোমার চোখ দুটো ভিজে গেল। তোমার কাঁপুনি আর থামে
না।
অকষ্মাৎ তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে। আমার ভেজা শার্ট-প্যান্ট তোমার গায়ে জড়িয়ে অনেকটা ভিজিয়ে দিলো। আমরা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
একটু হাঁটার পরে আবার
রিকশা পেলাম।
তুমি রিকশার ভেতরে আমার হাত ধরে আবার বললে- আদিত্য, কথা দাও, তুমি আমাকে সাঁতার শেখাবে। আমি শোনেও না শোনার ভান করে বসে থাকলাম। তারপর তোমাকে হলে পৌঁছে
দিয়ে আমি আমার হলে ফিরি। ভেজা শরীরে কাঁথা জড়িয়ে
ঘুমাই।
স্বপ্ন দেখি-আমি আবার সেই শাপলাভরা পুকুরে বুক
ভরা জলে দাঁড়িয়ে আছি। আমার দু’হাতের উপর তুমি সাদা হাঁসের মতো ভেসে ভেসে লাফিয়ে লাফিয়ে সামনের
দিকে এগিয়ে যাচ্ছো। তারপর .... ....
আমার ছোটবোনের এসএসসি
পরীক্ষা।
তোমার ছোট মামার বিয়ে। আমরা দুজনে দুদিকে ছুটে গেলাম। তুমি মামার বিয়েতে গেলে। যাবার আগে তোমার বাড়ির ঠিকানাটুকু লিখে দিলে আমার নোটবুকে; বলে গেলে পথ ঘাটের অবস্থাটা কেমন। আমাকে বারবার করে বললে-আদিত্য, তুমি রফিক মামার বিয়েতে আসবে। অবশ্যি আসবে। এসো আমাদের দ্বীপটুকু
দেখে যাও-তোমার পছন্দ হবে। আমি কথা দিলাম-যাবো। তবে মামার বিয়ের দুয়েকদিন পর।
আমি পরিবারের বড় ছেলে। রাজুর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করাটা ছিল বেশ জরুরি। বাবাকে দুদিনের দায়িত্ব দিয়ে এক ফাঁকে গিয়ে ঘুরে আসবো -এই ছিল কথা।
১৯৯১
সাল।
২৬ শে এপ্রিল মামার বিয়ে। আর ৩০ এপ্রিল এএসসি পরীক্ষা শুরু।
পরীক্ষা পেছালো।
তুমি কি জানো ? হ্যাঁ, আমি তোমার কাছে গিয়েছিলাম -বিয়ের তিন দিন পর;
৩০এপ্রিল।
সেদিন অঙ্গীকার আর অনুরাগের
চেয়ে আতঙ্কই ছিল অনেক বেশি। কারণ তুমি সাঁতার জানো
না।
তোমাকে এখনো সাঁতার শেখাতে পারিনি।
ঝকঝকে রোদ। সকাল ১১ টায় আমি তোমাদের দ্বীপে গিয়ে নামলাম। ওখানে আগে কখনো যাইনি। তোমাদের গ্রাম মাইটভাঙ্গা আরো একটু দূরে। হাঁটছি আর আমার বুক কাঁপছে। পথের দুধারে সারি সারি
লাশ পড়ে আছে-শত শত নারী শিশু বৃদ্ধ তরুণ একরাতেই শেষ। বাড়িঘর মন্দির মসজিদ মাদ্রাসা স্কুল সব নিশ্চিহ্ন। গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে গেছে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে। তোমার গ্রামে পৌঁছার আগেই বুঝেছি - না,
আমাদের আর দেখা হবে না। তোমাকে আর পাবো না। ২৯ শে এপ্রিলের কালরাত তোমাকে বাঁচতে দেবে না। হ্যাঁ,
আমাদের আর দেখা হলো না। আর দেখা হবে না।
আমি এখনও ছাতার সংসারে তোমাকে খুঁজি;
রিকশার সংসারে তোমাকে দেখি- পাই না। তোমাকে সাঁতার শেখানোর স্বপ্নটি এখনও বার বার আমার ঘুম ভাঙ্গায়। আমি থরথর করে কেঁপে ওঠি।
আদিত্য- তোমার বর্ষার বন্ধু।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন