বুধবার, ১০ জুলাই, ২০১৩

গল্প -ওই দেখো, মানিকজোড় যায়
















‘Long, long afterward, in an oak
I found the arrow, still unbroke;
And the song, from beginning to end,
I found again in the heart of a friend.’
―Henry Wadsworth Longfellow




ভুলু বাঁশি বাজায় এবং টুলু পশুপাখি শিকার করে; শিকারী ও বংশীবাদকদুই বন্ধু
গাঁয়ের এক কোণায় দুই বন্ধুর দুটো কুঁড়েঘর;  মাটির দেয়াল, শনপাতায় ছাওয়াদুর থেকে খুব সহজে চোখে পড়ে নাঘন গাছপালার সবুজ আড়ালে ঘেরাদুজনের বয়স কাছাকাছি

জরির স্বামী টুলু শিকারে যায় আর পরির স্বামী  ভুলু বাঁশি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে
জরি ও পরিহরি হর আত্মা; এক অপরকে পছন্দ করে ও ভালোবাসেতারাও সই পাতায়; বিপদে আপদে পরস্পর কাছে এসে দাঁড়ায়

এই দুটো বাড়ি ব্যস্ত জনপদ হতে একটু দূরেগ্রামের আলো ছায়ার শেষপ্রান্তে ; মাঠ পেরিয়ে বিলের শেষ দিকে পাহাড় ঘেঁষেমূল গ্রামের লোকজনের সাথে পুজো-পার্বন, ঈদ-কোরবান ছাড়া তাঁদের যোগাযোগ তেমন নেইদুই বন্ধু যখন হাটে যায়, এক সাথে যায়; এক সাথে ফিরেযখন গাঁয়ের এই আঁকাবাঁকা মেটোপথ মাড়িয়ে তারা বাড়ি ফিরে শেষ বিকেলের ঘন ছায়া নেমে আসেবনের ঝোঁপে ঝিঁ ঝিঁ ডাকেকালি বাড়ির তেতুল গাছে পাখা ঝাপটায় ঝুলন্ত বাদুড়ের দলঘরমুখো হাটুরে লোকজন তাদের দেখে  ঈর্ষা করে কেউ কেউ মুখ ফসকে বলে বসেওই দেখো, মানিকজোড় যায়তারা এসব যেন শুনেও শোনে না; কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ ঘরে ফিরে

বাড়ির পাশেই ছোট একটি পাহাড়ি ঝর্ণাপানি জমতে জমতে তৈরি ছোট পুকুরঝর্ণার পানিতে তারা রান্নাবান্না করে; আর কাপড়-চোপড় ধোয়আর দুই বন্ধু যখন তাদের কাজে বেরিয়ে পড়েদুই সই কলসি কাঁখে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরোয়গ্রামের মাঝামাঝি এক পাঠশালা; সেখানে আছে একটি  নলকূপ এই নলকূপ থেকে কলসি ভরে পানি আনেখাবারের পানিআসা যাওয়ার এই সময়টুকু তারা গালগল্প করেনিজের গল্প, পরের গল্প আর কখনো কখনো তাদের বরের গল্প
দুই সই যেন দুই দেহে এক প্রাণতারা এক সঙ্গে নলকূল থেকে পানি আনেএক সঙ্গে ঝর্ণায় নেমে গোসল করে; হাতে সময় থাকলে মাঝে মাঝে সাঁতার কাটেডুব দেয়জরি ডুব দিলে পরি অপেক্ষায় থাকে, পরি ডুব দিলে জরি অপেক্ষায় থাকে কখন অন্যজন ঝর্ণার তলা থেকে হেসে হেসে ভেসে ওঠবেআবার কখনো কখনো তারা ঝর্ণার জলে মাছ ধরেচিংড়ি, বাইম, টাকি, পুঁটি আর কই মাছে তাদের পুটুলি ভরে যায়
দুই বাড়ির সামনে-পেছনে, ডানে-বামে সবুজ ফসলের মাঠজরি আর পরি সেখানে লাউ, করলা, শিম, বেগুন, মরিচ, শসার চাষ করেউঠানে আছে ফলের বাগানজরি আর পরির বাগানে পেঁপে, কলা, লেবু সারা বছর ফলতে থাকেআরো আছে আম, কাঁঠাল, জাম, বেল, আমলকি, পেয়ারা, আমড়া প্রভৃতি সুস্বাদু ফলের বাগান
বলতে কী জরি আর পরির কোন অভাব নেইকারো প্রতি তাদের কোন অভিযোগ-অনুযোগও নেইগ্রামের কোন মানুষ এই দুই দম্পতির কথা বার্তায়, আচার ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছে, ব্যথিত হয়েছে এমন কথা কে কখনো শোনেনি

টুলু প্রতিদিন সকালে একমুটো সাদা ভাত মুখে দিয়ে তির-ধনুক-ছুরি নিয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটে চলে; বনে বনে ঘুরে বেড়ায়
আর ভুলু সকালে উঠে ভাত দুটো মুখে দেয়, মুখে দেয় এক খিলি পানতারপর  অজানার পথে পা বাড়ায়কাঁধে নেয় এক কুদরতি ঝোলাতার  এই ঝোলার ভেতরে মুরলি, সানাই, ঝাঁঝি, খোল, করতাল, কাড়া আর কত কী?
টুলু পাহাড়ের কোলে ঝোঁপের আড়ালে গিয়ে বসেফাঁদ পাতেবন মোরগের বাসা খোঁজেডাক শুনতে চেষ্টা করেবুনো পাখির সন্ধানে গাছের ডালে, পাহাড়ের গুহায়, নদীর ধারে দৃষ্টি ছুড়েবক, মোরগ, ঘুঘু , শালিক তার তির থেকে রেহাই পায় নাপাখি ধনুকের গায়ে গেঁথে হুমড়ি খেয়ে পড়েসে ছুরি নিয়ে জবাই করেবেতের ছিলায় গেঁথে নেয়বিকেলে যখন ঘরে ফিরে পাখির লম্বা গাঁথুনি তার কাঁধে ঝুলতে থাকেপ্রতিদিন ঘরে ফিরে সে কলামুড়ি খায়এক খিলি পান মুখে দেয়ার আগে ভুলুকে খবর দেয়ভুলুকে ডেকে এনে  পাখিগুলো তিন ভাগ করে বিলি করেএক ভাগ সে নিজের জন্যে রাখে, একভাগ ভুলু ও পরির জন্যেঅন্য ভাগটি প্রতিদিন গ্রামের যে কোন পছন্দের একজনকে দিয়ে আসেতারা এই ভাগ একজনকে একবারই দেয়পাখির ভাগ বাঁটোয়ারার কাজটি প্রায়শ ভুলুই করে ; কখনো কখনো জরিএই ভাবে টুলুর শিকারী জীবন চলতে থাকেমাঝে মাঝে সে জরির দীর্ঘশ্বাস অনুভব করেবুঝতে পারে নিঃসঙ্গ জরি সাথি চায়বন্ধু চায়সন্তানের প্রত্যাশায় দিন গোনেশেষ বিকেলে দুই বন্ধু গ্রামের হাটে যায়-আড্ডা পেটায়এক সঙ্গে ফিরে

ভুলু তার কুদরতি ঝোলা কাঁদে ঘুরে বেড়ায়হাটে মাঠে বাটেসে প্রথমে গ্রামের পাঠশালার কোণায় গিয়ে বসেকৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়তার সাতরঙা  শতরঞ্জিটি সে বিছায়তারপর তার সুরসরঞ্জামগুলো সামনে সাজিয়ে রেখে মুরলি দিয়ে শুরু করেছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো তখন বুঝতে পারে এ ভুলুর সুরভুবন ভোলানো সুরতারা তার  চারপাশে বসে পড়ে সে  একে একে সানাই বাজায়, মাদল বাজায়, খোল বাজায়, করতাল বাজায়, কাড়া বাজায়ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার বাজায়প্রতিটি বাদনের আগে বাজনার নাম বলে, ওস্তাদকে স্মরণ করে  তারপর শুরু করেতার প্রতিটি বাদন তিন তালির মাধ্যমে শেষ হয়তালিতে সবাই অংশ নেয়বেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে পড়েসে এভাবে বংশী বাজায়, বাজনা বাজায়হাটে মাঠে বাটেভুলু ঘরে ফিরলে পরির রাঙা মুখখানি দেখে অলৌকিক আনন্দে অপার ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে পড়েলুলু আর সুরি তার কোলে আর কাঁধে জড়িয়ে থাকে

২.
ভুলু টুলুর কষ্ট কোথায় বুঝতে পারেপরি জরির শূন্যতার বেদনাটুকু উপলব্ধি করে সব চেয়ে বেশিপরি এ কারণে সব সময় লুলু আর সুরিকে  জরির কাছেই রেখে ক্ষেতে কাজ করেরান্নাবান্না সেরে নেয়শেষে জরির ঘরে গিয়ে জরিকে সময় দেয় রান্নাবান্নায় সাহায্য করেএতে জরির সময় কাটেকিন্তু মন ভরে নাকখনো কখনো লুলু আর সুরিকে দেখলে তার বুকের ভেতরের হাহাকারটুকু হুহু করে ফেটে পড়েসে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না
টুলুর সঙ্গে একদিন ভুলু শিকারে যায়টুলু যথারীতি তির নেয়, ধনুক নেয়, ছুরি নেয়টোটামিয়ার পাহাড় পার হয়ে আলতাবানুর ছড়া দিয়ে তারা এগিয়ে যায়হঠা বংশীবাদক জানতে চায়:
টুলু, এটি কিসের ডাক ? এতো সুন্দরএতো মিষ্টি
ওই দেখ শিমুল ডালেবউ কথা কও ডাকছে
ছড়ার এক পাশে পানির স্রোতের ধারে বালির চর পড়েছেএই চরে একটি ছোট সাদাকালো পাখি লম্বা লেজ নেড়ে নেড়ে দ্রুত হাঁটছেছুটছে
টুলু, ওই পাখিটি কী সুন্দর নাচছে দেখোএটির নাম কী? বংশীবাদক আবার প্রশ্ন করে
ওহ, তুই চিনিস নাএটি খঞ্জনাএটি নাচের পাখিসে দিন টুলু শুধু একটি সাদা বক মেরেছিলবকটির বুকে তির লাগলে দুটো লম্বা সাদা পাখা ঝাপটিয়ে কক কক করে পালাতে গিয়ে মাটিতে লুটে পড়েএক দৌড়ে টুলু তা ধরে এনে ভুলুকে দেয়সে ছুরিটি হাতে নিয়ে বকটি জবাই করতে গিয়ে দেখে ভুলুর চোখ দুটো ভিজে গেছে, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রর শুভ্রদানাবিষয়টি টুলু বুঝতে পেরে সেদিন শিকার বন্ধ রেখে তারা ঘরে ফিরে আসে
পরদিন টুলু আর শিকারে যায়নিউঠোনে বসে জরির বাগানের দিকে তাকিয়ে আছেভুলু তার ঝোলা কাঁধে ঠিকই বেরিয়ে পড়েছেসে টুলুর কাছে এসে দাঁড়ায়; জরি তাকে বসতে বলেএক খিলি পান এনে দেয়তারপর ভুলুর সঙ্গে টুলুও বেরিয়ে পড়েটুলু কোথায় যাবে, কী করবে সে জানে নাতার কোন কাজ নেইআনমনে তারা হাঁটে; হাঁটতে থাকেসে দেখে কয়েকটি ছেলেমেয়ে ভুলুর পিছু নিয়েছে; তারা তখন পাঠশালায় যাচ্ছেহঠা একটি মেয়ে একটু এগিয়ে এসে ভুলুর হাত ধরে বলে ওঠে:
ভুলুকাকু, এই পাখাটি তোমার জন্যে; আম্মুর কাছ থেকে তোমার জন্যে নিয়ে এসেছিআমার আম্মু পাখা বানায় তোতোমাকে বাঁশি বাজাতে নিয়ে যাবো একদিনআমার ভাইয়া বাঁশি শোনবে
ঠিক আছে কাকুআমি আগামীকাল যাবোদুপুরে তোমার আব্বুকে থাকতে বলো
ওরা চলে গেলে তারা হাটের দিকে এগুতে শুরু করেভুলুর হাত থেকে টুলু পাখাটি নেয়হাতের কাজ খুব সুন্দর ; কাপড়ের উপর রঙিন সুতোয় বোনাআলপনা আঁকামোল্লার চা দোকানে তখন অনেকে ভুলুর অপেক্ষায়তারা দোকানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চা নাশতা চলে আসেআসে পানওতারপর ভুলুর ভুবনজয়ী বাঁশির সুরের মূর্ছনা দুপুর অবধি বাজতে থাকে

৩.
রাতে শিকারী ভুলুর কান্নার বিষয়টি স্ত্রী জরিকে বলেঘটনাটি শুনে সেও কেঁদে দেয়টুলু ব্যাপারটি টের পেলে জরির কান্না আরো বেড়ে যায়সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকে:
গতকাল দুপুরে  ক্ষেতে কাজ করতে করতে হঠা আমি ঘুমিয়ে পড়িঘুমের ঘোরে আমি স্বর্গের বাগানে এসে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে থাকিআমি  দেখি চারদিকে নানা বর্ণের নানা ধরনের শত শত পুষ্পরাজি সুবাস ছড়াচ্ছেবিচিত্র পাখির ডাক ও নানা ফুলের সুগন্ধে আমি প্রায় আচ্ছন্ন; হঠা  শুনতে পাই কয়েকটি শিশু আমাকে মা মা করে ডাকছেএকটি মেয়ে আমার কোলে উঠে বসে এবং বলে আমাকে ছাড়া মেয়েটির স্বর্গে আর ভালো লাগছে না সে আমাকে কাছে চায়, আমার কাছে যেতে চায়; কিন্তু আমাদের দুজনের মাঝে বয়ে চলছে একটি দীর্ঘ নদীপ্রতিনিয়ত এর স্রোত তীব্র গতিতে ধেয়ে চলছেএই রক্তগঙ্গা পাড়ি দিয়ে সে আর আমার কাছে যেতে পারছে নাযখন আমার বাগানে ফুল ফোটে, পাখি গায়, ফুল সুবাস ছড়ায় তখন রক্তনদীটি শুকিয়ে আস্তে আস্তে শুকোতে থাকে; তারা কয়েকজন মিলে আমাদের কাছে যেতে চেষ্টা করেকিন্তু পরদিন যখন তুমি পাখি শিকার কর, পাখি মারো, জবাই করো নদীটি আবারও  দীর্ঘ ও গভীর হয়ে যায়তারা আর যেতে পারে নাতারপর কাঁদতে কাঁদতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় 
ঘুম ভাঙ্গার পর জরি বুঝতে পারে টুলু পাখি শিকার বন্ধ না করলে তারা কখনো বাবামা হতে পারবে নাটুলু তার শিকারের নেশায় আনন্দের ঘোরে প্রাণপাতের প্রসঙ্গটি কখনো এভাবে ভাবেনি; ভাববার সুযোগও হয়নি তারতার নিজের ভেতর টানাপোড়েন চলতে থাকেহঠা নিজেকে সে ভীষণ অপরাধী ভাবতে থাকে; শত শত পশুপাখির রক্তাক্ত চিত্র তার চোখে বারবার ভেসে ওঠতে থাকেনিজের সখ শিকারের সঙ্গে নির্মমতার সম্পর্ক বুঝতে পারে
এরপর টুলু আর শিকারে যায় নাসে জরির সঙ্গে বাগানে ব্যস্ত সময় কাটায়শত শত পাখির ডাক ও বহুবর্ণ ফুলের সুবাস তাদের হৃদয়ে অপার আনন্দের দোলা দেয়পাখির আর ফুলের এক যাদুময় আচ্ছন্নতায় তারা বুঁদ হয়ে পড়ে
হয়তো একদিন ওই রক্তগঙ্গা  শুকোবেটুলু আর জরি  প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন