বুধবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৩
মঙ্গলবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৩
কবিতা - অচেনা আপন মুখ
ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি তখনো তোমার মুখ-নাক
লোমশ কঠিন বুকের খাদে বুনোঘাসে লাল কাঁকড়ার মতো হাঁটে;
এই আমি বেমালুম তোমাকে ভুলে দেখি অন্য নারী―খুঁজি অন্য নদী, অন্য সিঁথির ঢেউ;
হাওয়াই মিঠাই যেন ষোড়শীর ঠোঁট নিমিষে মিলায় স্বপ্নের ভেতর মাতাল মুগ্ধতায়;
কৈশোরের নাফ নদী আবার আমাকে ডাকে, এঁকে যাই উথাল মোহনার মুখ-কোহালিয়া চর।
ঘুম ভাঙ্গে―আয়নায় জেগে ওঠে অচেনা আপন মুখ বেদনায় বিব্রত,
নিজেকে গোপন করি―ভুলে যেতে চাই অসমাপ্ত চুম্বনজ্বর;
ঢেকে রেখে ভেজা বিছানা-মৃত প্রজাপ্রতি নিজেকে নির্ভার করি;
অচেনা আমরা ঘুমিয়েছি দিনরাত্রির ডানায় অলীক মায়ায় ঘোরের ভেতর;
আঠারো বছর শেষ―ঘরোয়া ঘুমের মাঝে বিমূঢ় বেদনাকে দেখি; নতুন এক চিত্রকল্প আঁকি।
কবিতা - মা
অবোধ শিশুর মতো হামাগুড়ি দিই―নীল জোছনার জলে হেমন্তে বসন্তে
কখনো দাঁড়িয়ে থাকি―গ্রীষ্মের দুপুরে পোড়া ট্রাফিক পুলিশ।
সবুজ ঘাসের জমি বসন্ত বাতাসে ছুটে চপল হরিণী― দূরে যেতে থাকি,
ভুলে যেতে থাকি অনায়াশে; নিশীথের নীল নৌকো খুঁজে সোনাদিয়া মাটি,
চকচকে গাড়ি লকলকে জিভে আমাকে তাড়ায়;
কালোমেঘ উড়ে গোধুলির খামে―প্রণয়ে পতন ঘটে।
বাবা হই, মাতা হই―সন্তানের রঙেগন্ধে কখনো তোমাকে খুঁজে
দিকভ্রান্ত নাবিকের মত ডেকে ওঠি মা, মা আমার;
ঈশানে বিজলি জ্বলে হিরোশিমা কাঁদে―বিষণ্ন বদ্বীপে নারগিস আসে, মহাসেন কাঁপে;
তোমার যুগল হাত কখনো সরে না, তোমার কোমল বুক কখনো সরে না, মা, মা আমার।
সুন্দরম ১৬বর্ষ প্রথম সংখ্যা বৈশাখ-আষাঢ় ১৪২১ বঙ্গাব্দ
বুধবার, ৩১ জুলাই, ২০১৩
কবিতা - চোখ
সুপুরি দানার মতো দুচোখ তোমার
আনন্দ আবেশে হাসে,
কূলভাঙা নাফ ছুটে যাই আমি
তোমাকে তোয়াফ করি - ঘুরি বারমাসে।
যখন তোমাকে পাই - আমার চোখের তারাজোছনা বাদলে ভাসে,
মুদিত দুচোখে তুমি অচিন মুদ্রায় নাচো
কিষাণী মজেছে বুঝি আমনের চাষে।
তোমার দুচোখে জ্বলে
হিরোশিমা নাগাসাকি - দুঃখ দগ্ধ মানবিক ভুলে,
শ্রাবণ মেঘের ছায়া জলের জোয়ার ডাকে প্রণয়ের ঘাসফুলে।
তোমার চোখের ভাষা বুঝি বা বুঝি না - তাকিয়ে থাকতে হয়,
একুশ বসন্ত ধরে পড়েছি দুচোখ এই - বুঝেছি তা' বুঝবার নয়।
২০১২ ইং
চট্টগ্রাম।
রচয়িতা-বইমেলা সংখ্যা ২০১৪,
দৈনিক পূর্বদেশ ১৩ মে ২০১৪,
দৈনিক সংবাদ ০৬ মার্চ ২০১৪,
মাসিক উত্তরাধিকার- নবপর্যায় ৫৩ তম সংখ্যা।
আনন্দ আবেশে হাসে,
কূলভাঙা নাফ ছুটে যাই আমি
তোমাকে তোয়াফ করি - ঘুরি বারমাসে।
যখন তোমাকে পাই - আমার চোখের তারাজোছনা বাদলে ভাসে,
মুদিত দুচোখে তুমি অচিন মুদ্রায় নাচো
কিষাণী মজেছে বুঝি আমনের চাষে।
তোমার দুচোখে জ্বলে
হিরোশিমা নাগাসাকি - দুঃখ দগ্ধ মানবিক ভুলে,
শ্রাবণ মেঘের ছায়া জলের জোয়ার ডাকে প্রণয়ের ঘাসফুলে।
তোমার চোখের ভাষা বুঝি বা বুঝি না - তাকিয়ে থাকতে হয়,
একুশ বসন্ত ধরে পড়েছি দুচোখ এই - বুঝেছি তা' বুঝবার নয়।
২০১২ ইং
চট্টগ্রাম।
রচয়িতা-বইমেলা সংখ্যা ২০১৪,
দৈনিক পূর্বদেশ ১৩ মে ২০১৪,
দৈনিক সংবাদ ০৬ মার্চ ২০১৪,
মাসিক উত্তরাধিকার- নবপর্যায় ৫৩ তম সংখ্যা।
মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই, ২০১৩
কবিতা - রাহেলাবুবু
শীতের রাতে বেজে ওঠে রুপোলি নূপুর- রাখালবালক যায়,
বাঁশপাতাবাঁশি লোকজ কবির গান; তরুণ সুপুরিপাতা স্বরলিপি তুলে সবুজ বাতাসে;
হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় রাহেলাবুবু- অপয়া কাকের কা-কা ডাকে প্রবাসী শহুরে সোয়ামিরে মনে পড়ে,
প্রথম রাতের শপথ-সোনাদানা মুক্তোমানিকে ভরিয়ে দেবো তোমার জিসম,
লালনীল ডুরে শাড়িতে পুরে যাবে দেরাজ সিন্দুক,
হাদিয়া পাঠাবো ঈদে কুরবানিতে তোমার বাপের বাড়ি- জোছনার ঢেউ নেমে আসবে তোমার বদনে,
- আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে
বেতবোনা মোড়ায় বসে তালপাতা হাতে দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে ওঠে নিকানো উঠোন,
আর কত দিন এভাবে যাবে রাহেলা বুবু,
খতিব ইমাম মানুষ- বর্ষা যায়, গ্রীষ্ম যায়, বসন্ত আসে- উনিতো আসে না,
মিলাদে মহফিলে যায় সাগরেদ মুরিদ অনেক, গলিতে গলিতে হাঁটে তাবিজ কবজ দেয়,
দোয়া দরুদ পড়ে- তশবিহ তাহলিল জানে
মাঝে মাঝে অন্যকে দিয়ে লিখিয়ে পাঠায় দুএকছত্র কুফুরি কালাম- বাংলা জানে না,
কখনো পড়েনি অবলার মন -খয়েরি রুমালে আলপনা এঁকে এঁকে কত দিন কাটে,
বিধবা বোনের স্নেহ, চিড়ে মুড়ি খই, কাউন ধানের ঘ্রাণে পোড়া লাগে,
অরণ্য নিষাদ রাখাল বালক যায়-
বাঁশপাতা বাজে ভুলো বাউলের সুরে আনমনা হয় নীলাভ প্রহর;
গুলতির চোটে পাখ ঝাপটায় ধূসরশালিক,
ধূসরশালিক রাহেলাবুবু ... ... ...।
কবিতা - তটিনী
তটিনী তেরসা নদী-
করে বার বার ভুল,
ভাঙ্গে কুল - রাখে খোলা আলুথালু চুল,
টিকালো নাকের ভাঁজে জ্বেলেছে মুক্তোর দীপ - শ্বেত নাকফুল।
তটিনী মানে না ব্যাকরণ
শুধু অকারণ কবিতা ও কথা লিখে,
চিকন নধর দেহ সুপুরি গাছের মতো একহারা লিকলিকে।
তটিনী মেলছে ডানা
হৃদয়ে বাঁধছে দানা রমণের বিষ,
উড়ু উড়ু মন যখন তখন বাজে মুঠোফোন অহর্নিশ।
সাজছে প্রথম নারী-
তটিনী পরছে শাড়ি, বাড়ি বাড়ি পই পই করে ফিরে,
রঙের বারতা মেখে ছুটছে সে এঁকেবেঁকে নোঙর বসাবে বুঝি শবরের তিরে।
তটিনী উতলা বেশ
খুলছে হৃদয়দেশ - যাদুর সকল জানালা কপাট,
জাত মান ভুলে চড়বে রতির শূলে তালিম নেবে সে প্রেম-প্রণয়ের পাঠ।
২০১২ ইং মহেশখালি।
কবিতা-সন্ন্যাস
কত না ডেকেছো তুমি―বাবুজি বাবুজি ওঠো ; কেঁপেছে তোমার সুর লীলা আর লাজে নিঃসঙ্গ ঘুঘুর মত দেখেছি ভেবেছি আমি―সটান পিঠের পর শুয়ে শুয়ে কত না দীঘল রাত; মোরগ ডেকেছে ভোরে ― দুটি পাখা পত পত করে―ওই সুরে ওই স্বরে ; দুইপায়ে হলুদআঙুল নখের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে কঁকিয়ে কত না দেখেছি আমি বধির ব্যাকুল,তোমাদের এই ডাক সবুজ বাতাস কাঁপিয়েছে ধানখেত দিগন্তের টানে ; তোমরা কি ভুলে গেছো―আজন্ম বধির আমি; কান জোড়া যদিও বিশাল ভগবান বুদ্ধের মত।
সংসার সঙসার―তবুও কিষান বধূ শুঁকে যায় মেঘের ঘ্রাণ ; সোনার নোলক হাসে নাকের উঠোনে,
নীল জলে নীল মেঘে যমুনা তেরচা ছুটে; কায়া আর মায়া জুড়ে নিপাট সন্ন্যাস।
দৈনিক সংবাদ ঈদসংখ্যা-২০১৩-তে প্রকাশিত।
বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০১৩
গল্প - থাবা
‘মা, মা জান, তুমি কেমন আছ, মা?
মা তোমার কোল জুড়ে
নেমে আসছে আঁধার রাতের পাপতাড়ুয়া―এক সোনালি চাঁদ; আসছেন এক মহামানব তিনি
যেন মেহেদি,
কবির বা ভগবান বুদ্ধ
। জগতের লাখ লাখ মানুষ তাঁর আদর্শের দীক্ষা
নেবে, তাঁর মন্ত্রে শান্তি খুঁজবে অসহায় বিপন্ন
মানুষ।
কুমারী মেরির মতো তোমার
বুক ভরে যাবে অযুত আলোর দীপ্ত শিখায় যেন মহান প্রভু মসিহর আগমনে।
মা,তুমি এই প্রবীণ পৃথিবীর এক ত্রাণকর্তাকে ধারন
করেছ মনের অজান্তে।
মা, এ তোমার পাপ নয়―এ ঈশ্বরের আশীর্বাদ; তোমার দায়িত্ব এখন এঁকে রক্ষা করা, এঁকে বাঁচিয়ে রাখা শুধু।
তুমি এখন মানব ইতিহাসের
অনিবার্য অংশ,
মা।’
স্বপ্নটি শেষ হবার
সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তার―কিন্তু কথাগুলো যেন
কানে এখনো বেজে যাচ্ছে ক্রমাগত। সে ম্যালেরিযয়া রোগীর
মত কাঁপতে থাকে থিরথির করে, তার পুরো শরীর দরদর
করে ঘেমে যায়;
নাকে কপালে উড়– বৃষ্টির শ্বেতস্বেদবিন্দু জমতে থাকে যেন। সে একেবারে ক্লান্ত অবষন্ন হয়ে পড়ে।
জয়া।
আনম্যারেড।
মা হচ্ছে-সেকেন্ড টাইম।
সুধীর ভট্টাচার্যের
প্রথম মেয়ে।
শাহেদ সারোয়ার লিটুকে ভালোবাসে সে।
সুধীর বাবুর চার মেয়ে―জয়া, জুঁই,জনা ও জেনি। চার টুকরো চাঁদ―সুধীরচন্দনার ঘরে বড় হচ্ছে। নাচে গানে পড়া লেখায়
চন্দনাদির মেয়েগুলোর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে পাশের সব ক’টি গ্রামে―পাড়ায় পাড়ায় সবার মুখে
মুখে।
জয়া যখন নাইনে সুধীরবাবুর
দু’দিন ধরে জ্বর । গলগল করে ক’বার বমি করে মাত্র। এভাবে তিনি চলে যাবেন কেউ ভাবেনি। বাবুর সৎকারের পর চন্দনাদির চোখ জোড়া অকূল পাথারে
যেন ভাসছে। দিদি খেয়াল করেন বাবুর মৃত্যুর পর অনাত্মীয়
পুরুষ অতিথির সংখ্যা যেন দিন দিন বাড়ছে তার ঘরে। জনা ও জেনি এখনো ছোট, প্রাইমারিতে পড়ে―এক সাথে তাদের স্কুলে আসা যাওয়া। স্কুলের মাস্টারি, মেয়েগুলোর পড়ালেখা, পারিবারিক বিভিন্ন চাপের কথা বলে তিনি জয়া
ও জুঁইকে তেমন কোন পুজোপার্বন বা মেলাতীর্থে যেতে দেন না। যেতে হলে নিজেও সাথে যান; সবাইকে নিয়ে ঘুরিয়ে
আসেন।
যত দুর্ভাবনা তাঁর
জুঁইকে নিয়ে;
সবে সেভেনে গেল। পাড়ার অন্য মেয়েদের সাথে সে তেমন মেশে না। কারো সাথে স্কুলে যাবে না। চতুর্দিকে ঝোপ জঙ্গলে ঠাসা গ্রামের সর্পিল মেটোপথ। সাইকেল চালিয়ে আড়াই কিলো রাস্তা পাড়ি দেয় প্রতিদিন, তারপর বিদ্যাপতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিমুলগাছটি
চোখে পড়ে। সাঁতার কাটবে ছেলেদের সঙ্গে দল বেঁধে, পুকুরের তলে ডুব দিয়ে তুলে আনে মাগুর টাকি
কই চিতল । স্কুল থেকে ফিরতে না ফিরতেই আবার ঘুড়ি নিয়ে
ভোঁ দৌড়। তালপুকুরের কোণে বসে বড়শি নিয়ে কাটিয়ে দেয়
সারা দুপুর ―-বিষণ্ন
বিকেল। দুরন্ত মেয়ে দুর্বার গতিতে গাঁয়ের পথে উথাল পাথাল ঢেউ তোলে। ব্রাহ্মণের মেয়ে, মা স্কুলমাস্টার তাতে কী? বাবা নেই, বড়ো কোন ভাই নেই―তা’কে সে থোড়া কেয়ারও করে না। এই মেয়ে যেন যমের পথ
আগলে দাঁড়ায়। দু’চোখ জুড়ে শুধু অন্ধকার দেখেন চন্দনাদি।
বশিরা, বশিরা বলে এখনো চিৎকার করছে কিশোরী চামেলি। মা জোছনা বালা মেয়ের মুখ চেপে ধরছে বার বার। বিমূঢ় পাথর হারাধন বাবু কপালে ডান হাত ঠেকিয়ে মোড়া পেতে বসে থেকে একান্তে ঝিমোয়
ঘরের দাওয়ায়।
কালাগাজি পাড়া গ্রামের
ইউপি মেম্বার হাজি সৈয়দ আহমদের তৃতীয় ঘরের চতুর্থ পুত্র কাজি বশির। হাজি সাহেবের তিন পরিবারে সতের সন্তানের যৌথ সংসার। কাজি বশির হাফেজ হিসাবে পরিচিত, বাবার হজের সময় সফর সঙ্গী হয়ে সঙ্গে ছিলেন
বলে কেউ কেউ আবার হাজি হিসাবেও তাজিম করে বেশ; আজ বার তের বছর ধরে তিনি শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক মকতবে মোদরেসি
করেন । ঘরে দুই স্ত্রীর সমান অভিযোগ―হুজুরজ্বী রাতে বাসায় থাকেন না, মকতবে খান, মকতবে ঘুমান―সংসার তাঁকে টানে না।
মাঠের কোণে তেতুলতলায়
বসে থেকে তাস পেটায় উঠতি বয়েসি বখাটের দল। পথের ধারে সিসিডিবির সাইক্লোন শেল্টার―তপন-সজল লতিফ-দেলোয়ার এই আড্ডার মধ্যমণি। বেকার অর্ধশিক্ষিত এই ছেলেগুলোর নাম মনে পড়লেই দিদির গা শির শির করে কাঁপে। তাঁর মাথা যেন ধড় থেকে আলাদা হয়ে যায়―লাটিমের মতো ঘুরতে থাকে। তিনি এই সব ভাবেন আর সুধীরবাবুর অকাল প্রস্থানের কথা তুলে ঈশ্বরকে
দুষতে থাকেন। দিদি মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে যান―গত বুধবার চামেলিকে মনু মিয়ার কাঁঠাল বাগানের
পেছনে পান বরজে পাওয়া যায়; সে হারাধন বাবুর ছোট
মেয়ে নাইনে গেল মাত্র। ফাইভ পর্যন্ত চন্দনাদির কাছে অনুসন্ধান প্রাইমারিতে
পড়েছে। পোষ্ট মাস্টার ফোরকান মিয়া দুপুরে অফিস থেকে
ফিরছেন―পথে অচেনা এক গোঙানির শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ায়। মাথার কালো ছাতা বন্ধ করে বগলের তলে নেন, কাঁঠাল বাগান দিয়ে পান খেতের দশ ভার ভেতরে
মাঝখানে ঢুকে দেখেন রক্তাক্ত শরীরের নগ্ন চামেলি কাতরাচ্ছে। তিনি গায়ের শার্ট খুলে চামেলির খালি গায়ে জড়িয়ে দেন; ছাতার কালো কাপড় ছিঁড়ে তাকে পরিয়ে দিয়ে আবরু
রক্ষার ব্যবস্থা করেন। যখন তিনি ভ্যান গাড়িতে করে চামেলিকে নিয়ে
হরিয়ার ছড়ার কালি মন্দির প্রাঙ্গনে পৌঁছেন, এর আগেই পাড়ার ঘরে ঘরে সন্ধ্যে বাতির আলো ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো গ্রামে ধিক ধিক রব ওঠে। হৃদরোগী হারাধন মেয়ের মুখ দেখে বুকের ডান পাশে হাত রাখে―দুপাড়ি দাঁত পরস্পর খিঁচিয়ে ঢলে পড়ে মূর্ছা
যায়। চামেলি ও তার মা ঘরের বাইরে যাওয়া অনন্তকালের
মতো বন্ধ করে দেয়।
রাত দু’টো।
অচেতন ঘুমের অতল আঁধারে
ডুবে ছিল জয়া। দীপান্বিতা চৌধুরি জয়া। সারাদিনের ধকল এখনো সারা শরীর জুড়ে বিড় বিড় করছে ―গুড়ানি দিয়ে কেউ যেন পিষে দিয়েছে হাতপা, পিঠপাঁজর, উরুগ্রীবা ও মাথা। এমনিতে শরীর ভালো নেই। প্রচণ্ড বমি আর মাথা
ব্যথা কিছুতেই সারছে না। খেতে অরুচি। শরীরটা যেন পাথরের মত ভারি ভারি লাগে। মনে সংশয়-শঙ্কার ঘুটঘুটে আঁধার জমাট বেঁধেছে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে। লিটুকে সে কিছুতেই ভুলতে পারে না, ক্ষমা করতে পারে না, আবার মেনে নিতেও পারে না তার কোন কথা। জয়া তার কথায় গত বছর একবার অ্যাবরশন করে । ডাক্তার শেফালির কাছে- সে হলি ক্লিনিকে বসে । শেফালির নাম শুনলেই তার মনে পড়ে ওটিতে নিয়ে যাবার কথা, খিস্তি খেউড়ের বান যেন-
‘আরে, টানবাজারের পরি একখান, লজ্জায় ত দেহি বাঁচে না। এক্কেবারে ঝিম ধইরা রইছে। রত্না, আপারে একডা বেগুন দে। শরীরডা একটু জুড়াই নিক।
খেলায় তো দেখি ম্যাডোনারে
হার মানাইছে,
পেটখান তো বানে ভাসা
মরা গাভির মতো ফুলাইছে, দেখছি। বুঝতে হবে না, ইনবার্সিটির পাক্কা খেলারাম, আমাগো কমলারে পাইছে।‘
তখন দুইরাত ক্লিনিকে
থাকার পর সন্ধ্যায় সে হলে ফিরেছিল। দুইমাস সে লিটুর সাথে
কথা বলেনি,
দেখা করেনি। কিন্তু গত মাসে পিকনিকের দিন রাতে এক সঙ্গে হলে ফেরার সময় মনের
অজান্তে আবার কথা বলা শুরু।
শেফালিকে লিটুই সব
খুলে বলেছে―ম্যানেজ করেছে। আর ইদানিং ডাক্তররাও যেন এ রকম অবাঞ্চিত অ্যাবরশনের জন্য মুখিয়ে থাকে। প্রথমে না-না করলেও পরে টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে নিয়ে ঠিকই হাত বাড়ায়, ছুরি চালায় জরায়ূর মুখে, তাঁদের হাতে খুন হয় কুমারীমাতার স্বপ্ন; হয়তো এ খুনের মাধ্যমে এক ধরনের দায়মুক্তির
স্বাদ খুঁজে কোন কোন কপোতকপোতী দু’জনেই। শুধু ভ্রূণ কেন জীবন্ত মনুষ্যশিশুকে তাঁদের খুন করতে বাঁধে না। সন্ধ্যে নামতে না নামতেই লিটু প্রীতিলতায় আসে―তারা প্রতিদিনের মত হলের গেট পেরিয়ে শহিদমিনারের কাছাকাছি এসে
বকুলতলা বসে।
জয়া একান্ত অনিচ্ছায়
বেরিয়েছে আজ। আকাশ ধূসর মেঘে ছাওয়া, চারপাশের গাছগাছালিতে ফুরফুরে বাতাসের দোলা
নেই। বকুলের ডালে বুলবুলিটি বিষণ্ন মনে বাচ্ছা দুটোকে
উম দিচ্ছে। দূরের মিনারটি আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে সেনবাড়ির
তালগাছের মত। মিনারের চূড়োয় একটি মেয়ে ঘুঘু করুণ বিউগলের
সুরে কেঁদে যাচ্ছে। ছেলে ঘুঘুটির জন্য সে কাঁদে, প্রতীক্ষা করে। লিটু প্রতিদিনের মতো জয়ার পাশে বসতে চায়― বসে তার হাত দুটো আলতোভাবে তুলে নেবে সে নিজ হাতের মুঠোয়। জয়া আজ পাশাপাশি নয় তার মুখোমুখি বসেছে। জয়া কাঁদছে, আর কঠিন পাথরের মত ঠায় বসে আছে।
‘জয়া, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে বিশ্বাস কর। না, আর কখনো আমি এই ভুল করব না। চল―শেফালিদির কাছে যাই।‘
‘না, আমি আর কোন গাইনির কাছে যাব না। নিজের ইচ্ছায় নিজের সন্তানকে চোখের সামনে খুন করতে দেব না।‘
‘তোমাকে বিশ্বাস করে আমি ভুল করেছি, লিটু। তোমাকে বিয়ের কথা বলে আমি নিজের কাছে ছোট হয়ে গেছি। তুমি চাকুরি খোঁজার কথা বলে, বুড়ো বাবামার সম্মতির
অপেক্ষার কথা বলে এতদিন আমাকে ঠকিয়েছো মাত্র।‘
‘আমি বুঝেছি তুমি কেন এতদিন মূলপ্রসঙ্গ এড়িয়ে
গেছো। তুমি তোমার ধর্মের কাছে বন্দি, তোমার প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির শেকলে বন্দি। তোমরা সৎ লোকের শাসনের কথা বলে―সততার চর্চা কর না, নিজদের নিয়ন্ত্রণ করতে পার না। তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে সময়ের শংসপ্তক মনে কর অথচ সাহস করে বলতে
পার না―আমি মানুষ, আমি পুরুষ, আমি প্রেমিক। আমি ভালোবাসি। এই আমার ভালোবাসার
মানুষ।’
‘প্রেম তোমাদের অভিনয়, ক্ষণিকের মোহ, তোমাদের স্বদেশ নেই, মনুষ্যত্ববোধ নেই, সংস্কৃতি নেই। জানি,
আমার কথায় তুমি আহত
হবে। আমি তোমার ভালোবাসায় নিরুপায় বলে কথাগুলো
বলে যেতে পারলাম।’
‘তোমার কাজল চোখের করাল থাবায় শত শত হায়েনা
লুকিয়ে আছে―তা তুমি দেখনি, আমি দেখেছি। তাই তুমি তোমার সন্তানকে অনায়াসে খুন করতে পার বারবার।‘
‘প্রেম শূন্য তোমার কঠিন হৃদয়। আজ আমি নিশ্চিহ্ন। আজ আমি মৃত―আমার আর বেঁচে থাকার অধিকার নেই। তোমাকে কথাগুলো বলা আমার দরকার ছিল―বলেছি। এখানেই আমার শান্তি।’
‘তুমি দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করবে না’―হু হু করে কেঁদে ওঠে জয়া।
তারা চুপচুাপ দশ পনের
মিনিট দু’জন বসে থাকে অচেনা মানুষের মতো।
লিটু জয়াকে কোন ভাবে
হলের গেটে পৌঁছে দেয়। সে ফিরে আসে আলাওলে। সে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি জয়া তার সাথে এত কঠোর হতে পারে। সে নিজেকে নিদোর্ষ ভাবতে চেষ্টা করে। সে চারপাশে এরকম আরো অসংখ্য সম্পর্ক দেখে
যেখানে দুজন মানুষের ধর্ম আলাদা, বর্ণ আলাদা। সে মনে করে এই সম্পর্কের তাবৎ ভুল ভ্রান্তি, সুখ দুঃখ,স্মৃতি বিস্মৃতির তারা
দু’জন সমান অংশীদার। তবে জয়া কেন এতো কঠোর হবে? ভ্রূণ হত্যার বিষয়
সে এড়িয়ে যায়―বিয়ের বিষয় তার একেবারে অবান্তর মনে হয়। তারপরও লিটু ভাবতে থাকে জয়া তার, একমাত্র তারই। সে জয়ার সম্মতির অপেক্ষায় প্রহর গোনে।
হঠাৎ চোখ দুটো আটকে যায় ―তখনো মাস্টার্সের ক্লাস পুরোদমে শুরু হয়নি
তার। করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ―সাদা শার্ট টান টান করে ইন করা কালোপ্যান্টের
গভীরে। চকচকে কালো জুতোয় সূর্যের আলো টিকরে পড়ছে। সে আবার দেখে; এই ঘনকালো দুটো চোখ, ছোট ছাঁটাচুল, ক্লিন শেভ্ড ছেলেটি তার যেন চেনাজানা আপন কোন কেউ। এক ধরনের অন্য অনুভূতি পুরো শরীরে দোলা দিয়ে যায়। সে আর ক্লাসে ঢুকে না। করিডোরে,
একটু দূরে সরে দাঁড়ায়―একটু পেছন করে দাঁড়ায়। যেন অন্য কারো জন্যে অপেক্ষা করছে জয়া। কারো উপস্থিতি টের পেরে ফিরে দাঁড়ায় সে―
‘এক্সকিউজ মি, আপনি কী দীপান্বিতা? আমি লিটু, আপনাদের পাশের স্কুলের শাহেদ সারোয়ার লিটু। আমরা একই কেন্দ্রের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম। শুনেছি আপনি ইকোনমিক্সে আছেন।‘
‘ওকে ফাইন। আমি ইনফ্যাক্ট তোমাকে একেবারে চিনিনি। ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ। তো,তুমি কোথায় কোন বিষয়ে আছো?’
‘আমি ইংলিশে। অনার্স ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে―এখানে এসে মাস্টার্সে
ভর্তি হলাম।‘
‘ফাইন, বেশ ভালো লাগলো তোমাকে পেয়ে। একটু তাড়া আছে। ক্লাসে যাই। থ্যান্কস।‘―এইভাবে আঠার মাস আগে তাদের রিলেশনের সূচনা। পহেলা বৈশাখ, পিকনিক, বার্থ ডে, ভ্যালেনটাইনস ডে এই সম্পর্ককে আরো গভীরে নিয়ে
যায়। ভালোবাসার ডুব সাঁতারে ভিজতে থাকে দুজন তরুণ
তরুণী-মনের অগোচরে। জয়ার আর ঘুম আসে না। প্রতিদিনের কথাগুলো ছবিগুলো চলচ্চিত্রের পর্দার মতো ক্রমান্বয়ে ভাসতে থাকে মনের
ক্যানভাসে।
জব এগজাম, মাম এগজাম. ফাইনাল এগজাম―এক জীবনে কত এগজাম যে দিতে হয়! গত কয়েক মাসে
অসংখ্য এগজাম সে দিয়েছে। আজকের এগজামটাই তার জীবনের শেষ এগজাম। সে এই মাতৃত্বের পরীক্ষায় পাশ করতে চায় যে কোন ত্যাগের বিনিময়ে। এটি তার শেষ এগজাম । আজকেও নাকি একটা কার্ড এসেছে। বাহ! সে হাসবে না কাঁদবে
বুঝতে পারে না।
ঘড়ির কাটা এখন তিনের
ঘরে। আবার হাই তোলে সে―টানা দীর্ঘহাই। শরীরটা ঝড়ের তোড়ে নেতানো বাঁশের মত ঢুলে পড়ছে। চোখ দু’টো মার্বেলের মত ভারি হয়ে আসে। উঠে। ধীরে ধীরে লকার খুলে
ভ্যালেনটাইনস ডে-র কেনা মেরুন শাড়িটি পরে। কপালে লালসূর্যটি আঁকে একমুহূর্তে। নববধূর অপূর্ব মুরতিতে
জেগে ওঠে তার দেহমন। আবছা আলোতে দেয়ালের বড় আয়নায় নিজেকে একবার
দেখে নেয়। সন্তর্পনে দরজার সিটকিনিটা খোলে। মুঠোফোনটা অফ করে। ৩০৩ নম্বর রুম থেকে বেরিয়ে আসে ছাদে।
কৃষ্ণপক্ষের গভীররাত। বুনো অন্ধকার। দূর গগনের অপার আঁধারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্ররাজি নিজস্ব দীপ্তিতে টিম
টিম করে জ্বলতে থাকে; নিভে আর জ্বলে। রুক্ষপথ―বন্ধুরযাত্রার স্মৃতি
তাকে পোড়ায়,
তাড়ায়। শিহরিত হয়। সচকিত হয়। খোলা আকাশের নিচে নববধূর পোষাকে নিমগ্ন নিশাচর এক তরুণী। পুরো ছাদে একা হাঁটে, একা কাঁদে, একা শিস দেয়। থপ থপ তালি দেয় আবার। তালিগুলো মুক্ত ছাদে মিশে যায়। হাওয়ার দোলে নিসর্গের
কোলে সে শুনতে পায় মৃত্তিকার ডাক, মুক্তির ডাক, সবুজ ঘাসের আলিঙ্গন আহ্বান। ছাদের সাইড ওয়ালে এক পা ওঠিয়ে অন্য পা পার করতে উদ্যত হয় সে।
নিক্ষিপ্ত উল্কার তীক্ষè দ্যুতিতে অকষ্মাৎ নিজেকে দেখে আতঙ্কিত হয় সে। সে দেখতে পায় দূরের শহিদমিনার এখনো আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে সটান গ্রীবায়। কয়েকটি লক্ষ্মীপেঁচা বার বার ডাকতে থাকে আকাশমণির পাশে-মেহগনি
বনে। তিনতলার অপর প্রান্তে হলের গার্ড বুড়ো মফিজ মিয়া কাশতে থাকে―ঘনকফ আটকে আছে তার বুকের গহনে, সাদা দাড়িতে টিকরে পড়ে আলোক রশ্মির ঝিলিক―পর পর বাঁশির শব্দে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ছাদের
দিকে আসতে থাকে সে।
জয়া এক দৌড়ে রুমে। ড্রয়ারটা টান দেয়। লম্বা খামটি খুলে তার চোখ ছানাবড়া―তাকে ডাকছে অন্য পৃথিবী। লালরঙা কাপড়ের ব্যাগে
ভরে নেয় কিছু কাপড়চোপড় টুকিটাকি জিনিসপত্তর। দীর্ঘ দশঘণ্টা জার্নি―জীবনগাড়ি থামে, জীবনের নতুন এক ক্যাম্পাসে―ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ।
বিশাল পৃথিবীর এই এক
কোণায় আলোর সাথে গলাগলি করে, হাওয়ার সাথে কোলাকুলি
করে স্বপ্নসাহসে আবার মেতে ওঠে সে।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং / দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত।
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ইং / দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং / দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত।
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ইং / দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)








