মঙ্গলবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৩

কবিতা - অচেনা আপন মুখ











ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি তখনো তোমার মুখ-নাক
লোমশ কঠিন বুকের খাদে বুনোঘাসে লাল কাঁকড়ার মতো হাঁটে;
এই আমি বেমালুম তোমাকে ভুলে দেখি অন্য নারী―খুঁজি অন্য নদী, অন্য সিঁথির ঢেউ;
হাওয়াই মিঠাই যেন ষোড়শীর ঠোঁট নিমিষে মিলায় স্বপ্নের ভেতর মাতাল মুগ্ধতায়;
কৈশোরের নাফ নদী আবার আমাকে ডাকে, এঁকে যাই উথাল মোহনার মুখ-কোহালিয়া চর।

ঘুম ভাঙ্গে―আয়নায় জেগে ওঠে অচেনা আপন মুখ বেদনায় বিব্রত,
নিজেকে গোপন করি―ভুলে যেতে চাই অসমাপ্ত চুম্বনজ্বর;
ঢেকে রেখে ভেজা বিছানা-মৃত প্রজাপ্রতি নিজেকে নির্ভার করি;

অচেনা আমরা ঘুমিয়েছি দিনরাত্রির ডানায় অলীক মায়ায় ঘোরের ভেতর;
আঠারো বছর শেষ―ঘরোয়া ঘুমের মাঝে বিমূঢ় বেদনাকে দেখি; নতুন এক চিত্রকল্প আঁকি।

কবিতা- ম্যাহ্লানু



















বুকের হাঁসুলি চাঁদ- থামির অরণ্যে মইনাক পাহাড়,
চুলির আড়ালে হাসে যমজ উড়িয়া আম;
আমলকি চোখ সুস্থির তির-
অঝোর আষাঢ়ে ছড়ায় ময়ূর পেখম,
আদিম মুদ্রায় কাঁপে রাখাইন তরুণ,
ম্যাহ্লানু, বনের ফুল- জলজ সুড়ঙ্গ চুলো পুড়ে জলটাকিমাছ।


কবিতা - মা



সাকিন জানি না ঠিক কোন দিকে যাব―উত্তরে দক্ষিণে পূর্বে বা পশ্চিমে;
অবোধ শিশুর মতো হামাগুড়ি দিই―নীল জোছনার জলে হেমন্তে বসন্তে
কখনো দাঁড়িয়ে থাকি―গ্রীষ্মের দুপুরে পোড়া ট্রাফিক পুলিশ।

সবুজ ঘাসের জমি বসন্ত বাতাসে ছুটে চপল হরিণী― দূরে যেতে থাকি,
ভুলে যেতে থাকি অনায়াশে; নিশীথের নীল নৌকো খুঁজে সোনাদিয়া মাটি,
চকচকে গাড়ি লকলকে জিভে আমাকে তাড়ায়;
কালোমেঘ উড়ে গোধুলির খামে―প্রণয়ে পতন ঘটে।

বাবা হই, মাতা হই―সন্তানের রঙেগন্ধে কখনো তোমাকে খুঁজে
দিকভ্রান্ত নাবিকের মত ডেকে ওঠি মা, মা আমার;


ঈশানে বিজলি জ্বলে হিরোশিমা কাঁদে―বিষণ্ন বদ্বীপে নারগিস আসে, মহাসেন কাঁপে;
তোমার যুগল হাত কখনো সরে না, তোমার কোমল বুক কখনো সরে না, মা, মা আমার।


সুন্দরম ১৬বর্ষ প্রথম সংখ্যা বৈশাখ-আষাঢ় ১৪২১ বঙ্গাব্দ











বুধবার, ৩১ জুলাই, ২০১৩

কবিতা - চোখ

সুপুরি দানার মতো দুচোখ তোমার
আনন্দ আবেশে হাসে,
কূলভাঙা নাফ ছুটে যাই আমি
তোমাকে তোয়াফ করি - ঘুরি বারমাসে।

যখন তোমাকে পাই - আমার চোখের তারাজোছনা বাদলে ভাসে,
মুদিত দুচোখে তুমি অচিন মুদ্রায় নাচো
কিষাণী মজেছে বুঝি আমনের চাষে।

তোমার দুচোখে জ্বলে
হিরোশিমা নাগাসাকি - দুঃখ দগ্ধ মানবিক ভুলে,
শ্রাবণ মেঘের ছায়া জলের জোয়ার ডাকে প্রণয়ের ঘাসফুলে।

তোমার চোখের ভাষা বুঝি বা বুঝি না - তাকিয়ে থাকতে হয়,
একুশ বসন্ত ধরে পড়েছি দুচোখ এই - বুঝেছি তা' বুঝবার নয়।


২০১২ ইং
চট্টগ্রাম।

রচয়িতা-বইমেলা সংখ্যা ২০১৪,
দৈনিক পূর্বদেশ ১৩ মে ২০১৪,
দৈনিক সংবাদ ০৬ মার্চ ২০১৪, 
মাসিক উত্তরাধিকার- নবপর্যায় ৫৩ তম সংখ্যা।









মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই, ২০১৩

কবিতা - রাহেলাবুবু



শীতের রাতে বেজে ওঠে রুপোলি নূপুর- রাখালবালক যায়,
বাঁশপাতাবাঁশি লোকজ কবির গান; তরুণ সুপুরিপাতা স্বরলিপি তুলে সবুজ বাতাসে;

হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় রাহেলাবুবু- অপয়া কাকের কা-কা ডাকে প্রবাসী শহুরে সোয়ামিরে মনে পড়ে,
প্রথম রাতের শপথ-সোনাদানা মুক্তোমানিকে ভরিয়ে দেবো তোমার জিসম,
লালনীল ডুরে শাড়িতে পুরে যাবে দেরাজ সিন্দুক,
হাদিয়া পাঠাবো  ঈদে কুরবানিতে তোমার বাপের বাড়ি- জোছনার ঢেউ নেমে আসবে তোমার বদনে,
- আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে
বেতবোনা মোড়ায় বসে তালপাতা হাতে দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে ওঠে নিকানো উঠোন,
আর কত দিন এভাবে যাবে  রাহেলা বুবু,
খতিব ইমাম  মানুষ- বর্ষা যায়, গ্রীষ্ম যায়, বসন্ত আসে-  উনিতো আসে না,
মিলাদে মহফিলে যায় সাগরেদ মুরিদ অনেক, গলিতে গলিতে হাঁটে তাবিজ কবজ দেয়,
দোয়া দরুদ পড়ে- তশবিহ তাহলিল জানে
মাঝে মাঝে অন্যকে দিয়ে  লিখিয়ে পাঠায় দুএকছত্র কুফুরি কালাম- বাংলা জানে না,
কখনো পড়েনি অবলার মন -খয়েরি রুমালে আলপনা এঁকে এঁকে কত দিন কাটে,
বিধবা বোনের স্নেহ, চিড়ে মুড়ি খই, কাউন ধানের ঘ্রাণে পোড়া লাগে,

অরণ্য নিষাদ রাখাল বালক যায়-
বাঁশপাতা বাজে ভুলো বাউলের সুরে আনমনা হয় নীলাভ প্রহর;
গুলতির চোটে পাখ ঝাপটায় ধূসরশালিক,
ধূসরশালিক রাহেলাবুবু ... ... ...।

কবিতা - তটিনী


তটিনী তেরসা নদী-
করে বার বার ভুল,
ভাঙ্গে কুল - রাখে খোলা আলুথালু চুল,
 টিকালো নাকের ভাঁজে জ্বেলেছে মুক্তোর দীপ - শ্বেত নাকফুল।

তটিনী মানে না ব্যাকরণ
শুধু অকারণ কবিতা ও কথা লিখে,
চিকন নধর দেহ সুপুরি গাছের মতো একহারা লিকলিকে।

তটিনী মেলছে ডানা
হৃদয়ে বাঁধছে দানা রমণের বিষ,
উড়ু উড়ু মন যখন তখন বাজে মুঠোফোন অহর্নিশ।

সাজছে প্রথম নারী-
তটিনী পরছে শাড়ি, বাড়ি বাড়ি পই পই করে ফিরে,
রঙের বারতা মেখে ছুটছে সে এঁকেবেঁকে নোঙর বসাবে বুঝি শবরের তিরে।

তটিনী উতলা বেশ
খুলছে হৃদয়দেশ - যাদুর সকল জানালা কপাট,
জাত মান ভুলে চড়বে রতির শূলে তালিম নেবে সে প্রেম-প্রণয়ের পাঠ।

 ২০১২ ইং মহেশখালি।

কবিতা-সন্ন্যাস














কত না ডেকেছো তুমি―বাবুজি বাবুজি ওঠো ; কেঁপেছে তোমার সুর লীলা আর লাজে নিঃসঙ্গ ঘুঘুর মত দেখেছি ভেবেছি আমি―সটান পিঠের পর শুয়ে শুয়ে কত না দীঘল রাত; মোরগ ডেকেছে ভোরে ― দুটি পাখা পত পত করে―ওই সুরে ওই স্বরে ; দুইপায়ে হলুদআঙুল নখের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে কঁকিয়ে কত না দেখেছি আমি বধির ব্যাকুল,তোমাদের এই ডাক সবুজ বাতাস কাঁপিয়েছে ধানখেত দিগন্তের টানে ; তোমরা কি ভুলে গেছো―আজন্ম বধির আমি; কান জোড়া যদিও বিশাল ভগবান বুদ্ধের মত।

সংসার সঙসার―তবুও কিষান বধূ শুঁকে যায় মেঘের ঘ্রাণ ; সোনার নোলক  হাসে নাকের উঠোনে,
নীল জলে নীল মেঘে যমুনা তেরচা ছুটে; কায়া আর মায়া জুড়ে নিপাট সন্ন্যাস।

দৈনিক সংবাদ ঈদসংখ্যা-২০১৩-তে প্রকাশিত।

বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০১৩

গল্প - থাবা



                                                     





মা, মা জান, তুমি কেমন আছ, মা?
মা তোমার কোল জুড়ে নেমে আসছে আঁধার রাতের পাপতাড়য়াএক সোনালি চাঁদ; আসছেন এক মহামানব তিনি যেন মেহেদি, কবির বা ভগবান বুদ্ধ জগতের লাখ লাখ মানুষ তাঁর আদর্শের দীক্ষা নেবে, তাঁর মন্ত্রে শান্তি খুঁজবে অসহায় বিপন্ন মানুষ
কুমারী মেরির মতো তোমার বুক ভরে যাবে অযুত আলোর দীপ্ত শিখায় যেন মহান প্রভু মসিহর আগমনে
মা,তুমি এই প্রবীণ পৃথিবীর এক ত্রাণকর্তাকে ধারন করেছ মনের অজান্তে
মা, এ তোমার পাপ নয়এ ঈশ্বরের আশীর্বাদ; তোমার দায়িত্ব এখন এঁকে রক্ষা করা, এঁকে বাঁচিয়ে রাখা শুধু
তুমি এখন মানব ইতিহাসের অনিবার্য অংশ, মা
স্বপ্নটি শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তারকিন্তু কথাগুলো যেন কানে এখনো বেজে যাচ্ছে ক্রমাগতসে ম্যালেরিযয়া রোগীর মত কাঁপতে থাকে থিরথির করে, তার পুরো শরীর দরদর করে ঘেমে যায়; নাকে কপালে উড়বৃষ্টির শ্বেতস্বেদবিন্দু জমতে থাকে যেনসে একেবারে ক্লান্ত অবষন্ন হয়ে পড়ে

জয়া
আনম্যারেড
মা হচ্ছে-সেকেন্ড টাইম
সুধীর ভট্টাচার্যের প্রথম মেয়ে
শাহেদ সারোয়ার লিটুকে  ভালোবাসে সে
সুধীর বাবুর চার মেয়েজয়া, জুঁই,জনা ও জেনিচার টুকরো চাঁদসুধীরচন্দনার ঘরে বড় হচ্ছেনাচে গানে পড়া লেখায় চন্দনাদির মেয়েগুলোর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে পাশের সব কটি গ্রামেপাড়ায় পাড়ায় সবার মুখে মুখে
জয়া যখন নাইনে সুধীরবাবুর দুদিন ধরে জ্বর গলগল করে কবার বমি করে মাত্রএভাবে তিনি চলে যাবেন কেউ ভাবেনিবাবুর সকারের পর চন্দনাদির চোখ জোড়া অকূল পাথারে যেন ভাসছেদিদি খেয়াল করেন বাবুর মৃত্যুর পর অনাত্মীয় পুরুষ অতিথির সংখ্যা যেন দিন দিন বাড়ছে তার ঘরেজনা ও জেনি এখনো ছোট, প্রাইমারিতে পড়েএক সাথে তাদের স্কুলে আসা যাওয়াস্কুলের মাস্টারি, মেয়েগুলোর  পড়ালেখা, পারিবারিক বিভিন্ন চাপের কথা বলে তিনি জয়া ও জুঁইকে তেমন কোন পুজোপার্বন বা মেলাতীর্থে যেতে দেন নাযেতে হলে নিজেও সাথে যান; সবাইকে নিয়ে ঘুরিয়ে আসেন
যত দুর্ভাবনা তাঁর জুঁইকে নিয়ে; সবে সেভেনে গেলপাড়ার অন্য মেয়েদের সাথে সে তেমন মেশে নাকারো সাথে স্কুলে যাবে নাচতুর্দিকে ঝোপ জঙ্গলে ঠাসা গ্রামের সর্পিল মেটোপথসাইকেল চালিয়ে আড়াই কিলো রাস্তা পাড়ি দেয় প্রতিদিন, তারপর বিদ্যাপতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিমুলগাছটি চোখে পড়েসাঁতার কাটবে ছেলেদের সঙ্গে দল বেঁধে, পুকুরের তলে ডুব দিয়ে তুলে আনে মাগুর টাকি কই চিতল স্কুল থেকে ফিরতে না ফিরতেই আবার ঘুড়ি নিয়ে ভোঁ দৌড়তালপুকুরের কোণে বসে বড়শি নিয়ে কাটিয়ে দেয় সারা দুপুর ―-বিষণ্ন বিকেলদুরন্ত মেয়ে দুর্বার গতিতে গাঁয়ের পথে উথাল পাথাল ঢেউ তোলেব্রাহ্মণের মেয়ে, মা স্কুলমাস্টার তাতে কী? বাবা নেই, বড়ো কোন ভাই নেইতাকে সে থোড়া কেয়ারও করে নাএই মেয়ে যেন যমের পথ আগলে দাঁড়ায়দুচোখ জুড়ে শুধু অন্ধকার দেখেন চন্দনাদি
বশিরা, বশিরা বলে এখনো চিকার করছে কিশোরী চামেলিমা জোছনা বালা মেয়ের মুখ চেপে ধরছে বার বারবিমূঢ় পাথর হারাধন বাবু কপালে ডান হাত ঠেকিয়ে মোড়া পেতে বসে থেকে একান্তে ঝিমোয় ঘরের দাওয়ায়
কালাগাজি পাড়া গ্রামের ইউপি মেম্বার হাজি সৈয়দ আহমদের তৃতীয় ঘরের চতুর্থ পুত্র কাজি বশিরহাজি সাহেবের তিন পরিবারে সতের সন্তানের যৌথ সংসারকাজি বশির হাফেজ হিসাবে পরিচিত, বাবার হজের সময় সফর সঙ্গী হয়ে সঙ্গে ছিলেন বলে কেউ কেউ আবার হাজি হিসাবেও তাজিম করে বেশ; আজ বার তের বছর ধরে তিনি শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক মকতবে মোদরেসি করেন ঘরে দুই স্ত্রীর সমান অভিযোগহুজুরজ্বী রাতে বাসায় থাকেন না, মকতবে খান, মকতবে ঘুমানসংসার তাঁকে টানে না                                                                            
মাঠের কোণে তেতুলতলায় বসে থেকে তাস পেটায় উঠতি বয়েসি বখাটের দলপথের ধারে সিসিডিবির সাইক্লোন শেল্টারতপন-সজল লতিফ-দেলোয়ার এই আড্ডার মধ্যমণিবেকার অর্ধশিক্ষিত এই ছেলেগুলোর নাম মনে পড়লেই দিদির গা শির শির করে কাঁপেতাঁর মাথা যেন ধড় থেকে আলাদা হয়ে যায়লাটিমের মতো ঘুরতে থাকেতিনি এই সব ভাবেন আর সুধীরবাবুর অকাল প্রস্থানের কথা তুলে ঈশ্বরকে দুষতে থাকেনদিদি মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে যানগত বুধবার চামেলিকে মনু মিয়ার কাঁঠাল বাগানের পেছনে পান বরজে পাওয়া যায়; সে হারাধন বাবুর ছোট মেয়ে নাইনে গেল মাত্রফাইভ পর্যন্ত চন্দনাদির কাছে অনুসন্ধান প্রাইমারিতে পড়েছেপোষ্ট মাস্টার ফোরকান মিয়া দুপুরে অফিস থেকে ফিরছেনপথে অচেনা এক গোঙানির শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ায়মাথার কালো ছাতা বন্ধ করে বগলের তলে নেন, কাঁঠাল বাগান দিয়ে পান খেতের দশ ভার ভেতরে মাঝখানে ঢুকে দেখেন রক্তাক্ত শরীরের নগ্ন চামেলি কাতরাচ্ছেতিনি গায়ের শার্ট খুলে চামেলির খালি গায়ে জড়িয়ে দেন; ছাতার কালো কাপড় ছিঁড়ে তাকে পরিয়ে দিয়ে আবরু রক্ষার ব্যবস্থা করেনযখন তিনি ভ্যান গাড়িতে করে চামেলিকে নিয়ে হরিয়ার ছড়ার কালি মন্দির প্রাঙ্গনে পৌঁছেন, এর আগেই পাড়ার ঘরে ঘরে সন্ধ্যে বাতির আলো ছড়িয়ে পড়েছেপুরো গ্রামে ধিক ধিক রব ওঠেহৃদরোগী হারাধন মেয়ের মুখ দেখে বুকের ডান পাশে হাত রাখেদুপাড়ি দাঁত পরস্পর খিঁচিয়ে ঢলে পড়ে মূর্ছা যায়চামেলি ও তার মা ঘরের বাইরে যাওয়া অনন্তকালের মতো বন্ধ করে দেয়
রাত দুটো
অচেতন ঘুমের অতল আঁধারে ডুবে ছিল জয়াদীপান্বিতা চৌধুরি জয়াসারাদিনের ধকল এখনো সারা শরীর জুড়ে বিড় বিড় করছে গুড়ানি দিয়ে কেউ যেন পিষে দিয়েছে হাতপা, পিঠপাঁজর, উরুগ্রীবা ও মাথাএমনিতে শরীর ভালো নেইপ্রচণ্ড বমি আর মাথা ব্যথা কিছুতেই সারছে নাখেতে অরুচিশরীরটা যেন পাথরের মত ভারি ভারি লাগেমনে সংশয়-শঙ্কার ঘুটঘুটে আঁধার জমাট বেঁধেছে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেলিটুকে সে কিছুতেই ভুলতে পারে না, ক্ষমা করতে পারে না, আবার মেনে নিতেও পারে না তার কোন কথাজয়া তার কথায় গত বছর একবার অ্যাবরশন করে ডাক্তার শেফালির কাছে- সে হলি ক্লিনিকে বসে শেফালির নাম শুনলেই তার মনে পড়ে ওটিতে নিয়ে যাবার কথা, খিস্তি খেউড়ের বান যেন-
আরে, টানবাজারের পরি একখান, লজ্জায় ত দেহি বাঁচে নাএক্কেবারে ঝিম ধইরা রইছেত্না, আপারে একডা বেগুন দেশরীরডা একটু জুড়াই নিক
খেলায় তো দেখি ম্যাডোনারে হার মানাইছে, পেটখান তো বানে ভাসা মরা গাভির মতো ফুলাইছে, দেখছিবুঝতে হবে না, ইনবার্সিটির পাক্কা খেলারাম, আমাগো কমলারে পাইছে
তখন দুইরাত ক্লিনিকে থাকার পর সন্ধ্যায় সে হলে ফিরেছিলদুইমাস সে লিটুর সাথে কথা বলেনি, দেখা করেনিকিন্তু গত মাসে পিকনিকের দিন রাতে এক সঙ্গে হলে ফেরার সময় মনের অজান্তে আবার কথা বলা শুরু
শেফালিকে লিটুই সব খুলে বলেছেম্যানেজ করেছেআর ইদানিং ডাক্তররাও যেন এ রকম অবাঞ্চিত অ্যাবরশনের জন্য মুখিয়ে থাকেপ্রথমে না-না করলেও পরে টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে নিয়ে ঠিকই হাত বাড়ায়, ছুরি চালায় জরায়ূর মুখে, তাঁদের হাতে খুন হয় কুমারীমাতার স্বপ্ন; হয়তো এ খুনের মাধ্যমে এক ধরনের দায়মুক্তির স্বাদ খুঁজে কোন কোন কপোতকপোতী দুজনেইশুধু ভ্রণ কেন জীবন্ত মনুষ্যশিশুকে তাঁদের খুন করতে বাঁধে নাসন্ধ্যে নামতে না নামতেই লিটু প্রীতিলতায় আসেতারা প্রতিদিনের মত হলের গেট পেরিয়ে শহিদমিনারের কাছাকাছি এসে বকুলতলা বসে
জয়া একান্ত অনিচ্ছায় বেরিয়েছে আজআকাশ ধূসর মেঘে ছাওয়া, চারপাশের গাছগাছালিতে ফুরফুরে বাতাসের দোলা নেইবকুলের ডালে বুলবুলিটি বিষণ্ন মনে বাচ্ছা দুটোকে উম দিচ্ছেদূরের মিনারটি আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে সেনবাড়ির তালগাছের মতমিনারের চূড়োয় একটি মেয়ে ঘুঘু করুণ বিউগলের সুরে কেঁদে যাচ্ছেছেলে ঘুঘুটির জন্য সে কাঁদে, প্রতীক্ষা করেলিটু প্রতিদিনের মতো জয়ার পাশে বসতে চায়বসে তার হাত দুটো আলতোভাবে তুলে নেবে সে নিজ হাতের মুঠোয়জয়া আজ পাশাপাশি নয় তার মুখোমুখি বসেছেজয়া কাঁদছে, আর কঠিন পাথরের মত ঠায় বসে আছে
জয়া, তুমি আমাকে ক্ষমা করআমাকে বিশ্বাস করনা, আর কখনো আমি এই ভুল করব নাচলশেফালিদির কাছে যাই
না, আমি আর কোন গাইনির কাছে যাব নানিজের ইচ্ছায় নিজের সন্তানকে চোখের সামনে খুন করতে দেব না
তোমাকে বিশ্বাস করে আমি ভুল করেছি, লিটুতোমাকে বিয়ের কথা বলে আমি নিজের কাছে ছোট হয়ে গেছিতুমি চাকুরি খোঁজার কথা বলে, বুড়ো বাবামার সম্মতির অপেক্ষার কথা বলে এতদিন আমাকে ঠকিয়েছো মাত্র
আমি বুঝেছি তুমি কেন এতদিন মূলপ্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছোতুমি তোমার ধর্মের কাছে বন্দি, তোমার প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির শেকলে বন্দিতোমরা স লোকের শাসনের কথা বলেসততার চর্চা কর না, নিজদের নিয়ন্ত্রণ করতে পার নাতোমরা নিজেরা নিজেদেরকে সময়ের শংসপ্তক মনে কর অথচ সাহস করে বলতে পার নাআমি মানুষ, আমি পুরুষ, আমি প্রেমিকআমি ভালোবাসিএই আমার ভালোবাসার মানুষ
প্রেম তোমাদের অভিনয়, ক্ষণিকের মোহ, তোমাদের স্বদেশ নেই, মনুষ্যত্ববোধ নেই, সংস্কৃতি নেইজানি, আমার কথায় তুমি আহত হবেআমি তোমার ভালোবাসায় নিরুপায় বলে কথাগুলো বলে যেতে পারলাম
তোমার কাজল চোখের করাল থাবায় শত শত হায়েনা লুকিয়ে আছেতা তুমি দেখনি, আমি দেখেছিতাই তুমি তোমার সন্তানকে অনায়াসে খুন করতে পার বারবার
প্রেম শূন্য তোমার কঠিন হৃদয়আজ আমি নিশ্চিহ্নআজ আমি মৃতআমার আর বেঁচে থাকার অধিকার নেইতোমাকে কথাগুলো বলা আমার দরকার ছিলবলেছিএখানেই আমার শান্তি
তুমি দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করবে না’―হু হু করে কেঁদে ওঠে জয়া

তারা চুপচুাপ দশ পনের মিনিট দুজন বসে থাকে অচেনা মানুষের মতো
লিটু জয়াকে কোন ভাবে হলের গেটে পৌঁছে দেয়সে ফিরে আসে আলাওলেসে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি জয়া তার সাথে এত কঠোর হতে পারেসে নিজেকে নিদোর্ষ ভাবতে চেষ্টা করেসে চারপাশে এরকম আরো অসংখ্য সম্পর্ক  দেখে যেখানে দুজন মানুষের ধর্ম আলাদা, বর্ণ আলাদাসে মনে করে এই সম্পর্কের তাব ভুল ভ্রান্তি, সুখ দুঃখ,স্মৃতি বিস্মৃতির তারা দুজন সমান অংশীদারতবে জয়া কেন এতো কঠোর হবে? ভ্রূণ হত্যার বিষয় সে এড়িয়ে যায়বিয়ের বিষয় তার একেবারে অবান্তর মনে হয়তারপরও লিটু ভাবতে থাকে জয়া তার, একমাত্র তারইসে জয়ার সম্মতির অপেক্ষায় প্রহর গোনে
হঠা চোখ দুটো আটকে যায় তখনো মাস্টার্সের ক্লাস পুরোদমে শুরু হয়নি তারকরিডোরে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণসাদা শার্ট টান টান করে ইন করা কালোপ্যান্টের গভীরেচকচকে কালো জুতোয় সূর্যের আলো টিকরে পড়ছেসে আবার দেখে; এই ঘনকালো দুটো চোখ, ছোট ছাঁটাচুল, ক্লিন শেভ্ড ছেলেটি তার যেন চেনাজানা আপন কোন কেউএক ধরনের অন্য অনুভূতি পুরো শরীরে দোলা দিয়ে যায়সে আর ক্লাসে ঢুকে নাকরিডোরে, একটু দূরে সরে দাঁড়ায়একটু পেছন করে দাঁড়ায়যেন অন্য কারো জন্যে অপেক্ষা করছে জয়াকারো উপস্থিতি টের পেরে ফিরে দাঁড়ায় সে
এক্সকিউজ মি,  আপনি কী দীপান্বিতা? আমি লিটু, আপনাদের পাশের স্কুলের শাহেদ সারোয়ার লিটুআমরা একই কেন্দ্রের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলামশুনেছি আপনি ইকোনমিক্সে আছেন
ওকে ফাইনআমি ইনফ্যাক্ট তোমাকে একেবারে চিনিনিডোন্ট মাইন্ড প্লিজতো,তুমি কোথায় কোন বিষয়ে আছো?’
আমি ইংলিশেঅনার্স ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকেএখানে এসে মাস্টার্সে ভর্তি হলাম
ফাইন, বেশ ভালো লাগলো তোমাকে পেয়েএকটু তাড়া আছেক্লাসে যাইথ্যান্কস‘―এইভাবে আঠার মাস আগে তাদের রিলেশনের সূচনাপহেলা বৈশাখ, পিকনিক, বার্থ ডে, ভ্যালেনটাইনস ডে এই সম্পর্ককে আরো গভীরে নিয়ে যায়ভালোবাসার ডুব সাঁতারে ভিজতে থাকে দুজন তরুণ তরুণী-মনের অগোচরেজয়ার আর ঘুম আসে নাপ্রতিদিনের কথাগুলো ছবিগুলো চলচ্চিত্রের পর্দার মতো ক্রমান্বয়ে ভাসতে থাকে মনের ক্যানভাসে
জব এগজাম, মাম এগজাম. ফাইনাল এগজামএক জীবনে কত এগজাম যে দিতে হয়! গত কয়েক মাসে অসংখ্য এগজাম সে দিয়েছেআজকের এগজামটাই তার জীবনের শেষ এগজামসে এই মাতৃত্বের পরীক্ষায় পাশ করতে চায় যে কোন ত্যাগের বিনিময়েএটি তার শেষ এগজাম আজকেও নাকি একটা কার্ড এসেছেবাহ! সে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না
ঘড়ির কাটা এখন তিনের ঘরেআবার হাই তোলে সেটানা দীর্ঘহাইশরীরটা ঝড়ের তোড়ে নেতানো বাঁশের মত ঢুলে পড়ছেচোখ দুটো মার্বেলের মত ভারি হয়ে আসেউঠেধীরে ধীরে লকার খুলে ভ্যালেনটাইনস ডে-র কেনা মেরুন শাড়িটি পরেকপালে লালসূর্যটি আঁকে একমুহূর্তেনববধূর অপূর্ব মুরতিতে জেগে ওঠে তার দেহমনআবছা আলোতে দেয়ালের বড় আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নেয়সন্তর্পনে দরজার সিটকিনিটা খোলেমুঠোফোনটা অফ করে৩০৩ নম্বর রুম থেকে বেরিয়ে আসে ছাদে
কৃষ্ণপক্ষের গভীররাতবুনো অন্ধকারদূর গগনের অপার আঁধারে  ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্ররাজি নিজস্ব দীপ্তিতে টিম টিম করে জ্বলতে থাকে; নিভে আর জ্বলেরুক্ষপথবন্ধুরযাত্রার স্মৃতি তাকে পোড়ায়, তাড়ায়শিহরিত হয়সচকিত হয়খোলা আকাশের নিচে নববধূর পোষাকে নিমগ্ন নিশাচর এক তরুণীপুরো ছাদে একা হাঁটে, একা কাঁদে, একা শিস দেয়থপ থপ তালি দেয় আবারতালিগুলো মুক্ত ছাদে মিশে যায়হাওয়ার দোলে নিসর্গের কোলে সে শুনতে পায় মৃত্তিকার ডাক, মুক্তির ডাক, সবুজ ঘাসের আলিঙ্গন আহ্বানছাদের সাইড ওয়ালে এক পা ওঠিয়ে অন্য পা পার করতে উদ্যত হয় সে
নিক্ষিপ্ত উল্কার তীক্ষè দ্যুতিতে অকষ্মা নিজেকে দেখে আতঙ্কিত হয় সেসে দেখতে পায় দূরের শহিদমিনার এখনো আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে সটান গ্রীবায়কয়েকটি লক্ষ্মীপেঁচা বার বার ডাকতে থাকে আকাশমণির পাশে-মেহগনি বনেতিনতলার অপর প্রান্তে হলের গার্ড বুড়ো  মফিজ মিয়া কাশতে থাকেঘনকফ আটকে আছে তার বুকের গহনে, সাদা দাড়িতে টিকরে পড়ে আলোক রশ্মির ঝিলিকপর পর বাঁশির শব্দে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ছাদের দিকে আসতে থাকে সে
জয়া এক দৌড়ে রুমেড্রয়ারটা টান দেয়লম্বা খামটি খুলে তার চোখ ছানাবড়াতাকে ডাকছে অন্য পৃথিবীলালরঙা কাপড়ের ব্যাগে ভরে নেয় কিছু কাপড়চোপড় টুকিটাকি জিনিসপত্তরদীর্ঘ দশঘণ্টা জার্নিজীবনগাড়ি থামে, জীবনের নতুন এক ক্যাম্পাসেময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ
বিশাল পৃথিবীর এই এক কোণায় আলোর সাথে গলাগলি করে, হাওয়ার সাথে কোলাকুলি করে স্বপ্নসাহসে আবার মেতে ওঠে সে


১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং / দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত।
১২  সেপ্টেম্বর ২০১৩ ইং / দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত।